বিবাহের কথা বলতে গাড়ি চালিয়ে পৌঁছলেন রোগী, অবসাদের চিকিৎসায় ফিরল দেহ

মৃত যুবক, ডানদিকে অভিযুক্ত ডাক্তার

বিশ্বজিৎ ঘোষ, কলকাতা: অবসাদের চিকিৎসার জন্য বছর ৪১-এর রণদীপ বসু নিজেই গাড়ি চালিয়ে গত তিন এপ্রিল পৌঁছে গিয়েছিলেন সল্টলেকের এক চিকিৎসাকেন্দ্র, ইউএমএ নলিনী মেরি ক্লিনিক অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটে৷ যদিও, তিনি জানতেন না যে, তাঁকে বেসরকারি ওই চিকিৎসাকেন্দ্রে অবসাদের চিকিসার জন্য যেতে হচ্ছে৷ কারণ, তিনি চিকিৎসা করাতে চাইছিলেন না৷ যে কারণে, তাঁকে এমনই বোঝানো হয়েছিল যে, বিবাহের জন্য পাত্রীর আত্মীয়দের সঙ্গে সেখানে তাঁকে দেখা করতে যেতে হচ্ছে৷

অথচ, অবসাদের চিকিৎসা করাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারাতে হল রণদীপ বসুকে৷ এই ঘটনায় এক ডাক্তার এবং সল্টলেকের বেসরকারি ওই চিকিৎসাকেন্দ্রের নামে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেছেন পরিজনরা৷ আগে বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করতেন রণদীপ বসু৷ পরে, তিনি ব্যবসার চেষ্টাও করেছিলেন৷ হরিনাভির বাসিন্দা মৃত এই যুবকের বাবা আলিপুর পুলিশ কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট প্রদীপকুমার বসু৷ তাঁরই অধীনে রয়েছেন শর্মিলা নাথ৷ তিনি বলেন, ‘‘কয়েক বছর আগে রণদীপের বিয়ে হলেও, আইন অনুযায়ী সেটা বাতিল হিসেবে গণ্য হয়৷ তার পর থেকে ওর অবসাদের সমস্যা দেখা দেয়৷ সল্টলেকের ইউএমএ নলিনী মেরি ক্লিনিক অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটে ভর্তি করানোর আগেও ওর চিকিৎসা চলছিল৷’’

একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘গত তিন এপ্রিল সল্টলেকের এই হাসপাতালে নিজেই গাড়ি চালিয়ে গিয়েছিল রণদীপ৷ কারণ, রণদীপ জানত, পাত্রীর আত্মীয়দের সঙ্গে ও কথা বলতে যাচ্ছে৷ অবসাদের চিকিৎসার জন্য ওই দিন ডাক্তার রূপেন্দ্রকুমার ব্রহ্মর অধীনে রণদীপকে ভর্তি করানো হয়েছিল৷’’ কিন্তু, তার পর? শর্মিলা নাথের কথায়, ‘‘ডাক্তার রূপেন্দ্রকুমার ব্রহ্ম বলেছিলেন, এর আগে রণদীপের যে সব চিকিৎসা হয়েছিল, সে সব ভুল ছিল৷ তবে, সপ্তাহ দু’য়ের মধ্যে ও সুস্থ হয়ে যাবে৷ কিন্তু, হাসপাতালে থাকার সময় রণদীপের সঙ্গে কেউ দেখা করতে পারবে না৷ যদি তিনি বলেন, তবে রণদীপের সঙ্গে দেখা করা যাবে৷ আমরা এ সব মেনে নিয়েছিলাম৷’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘মাঝে মধ্যে রণদীপের বাবা-মা ডাক্তারকে বলতেন যাতে তাঁরা ওর সঙ্গে দেখা করতে পারেন৷ শনিবার, ২০ মে বিকেলেও সেই মতো তাঁদের দেখা করতে যাওয়ার কথা ছিল৷ কিন্তু, এ দিন সকাল ন’টা নাগাদ রণদীপের বাবাকে ফোন করে জানানো হয়, সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ ওর মৃত্যু হয়েছে৷ অথচ, শুক্রবারই রণদীপের সঙ্গে ফোনে ওর বাবা-মায়ের কথা হয়েছে৷’’

- Advertisement -

অবসাদের চিকিৎসায় কী এমন ঘটল যে প্রাণ হারাতে হল? শর্মিলা নাথ বলেন, ‘‘গত ২৮ এপ্রিল ফোন করে জানানো হয়েছিল, রণদীপের জ্বর রয়েছে৷ যে জন্য পরের দিন সল্টলেকের বৈশাখীর একটি কেন্দ্রে ওর কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হবে৷ তার জন্য প্রয়োজনীয় টাকা নিয়ে পরের দিন যাওয়ার কথা বলেছিলেন ডাক্তার রূপেন্দ্রকুমার ব্রহ্ম৷ তখন আমরা জানতে পেরেছিলাম, কয়েক দিন ধরেই ওর জ্বর ছিল৷ অতিরিক্ত মাত্রায় ওষুধের জন্য জ্বর এসেছিল৷ অথচ, এ সব বিষয় কিছুই আমাদের জানানো হয়নি৷’’ তিনি বলেন, ‘‘তখনই আমরা ডাক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম৷ কিন্তু, ডাক্তারের আচরণ যে রকম দেখছিলাম, তাতে আমরা আশঙ্কায় ছিলাম, অভিযোগ জানানোর পরে রণদীপের সঙ্গে চিকিৎসার নামে কোনও ভুল করা হবে না তো! যে কারণে, তখন আমরা আর অভিযোগ করিনি৷’’

এখানেও শেষ নয়৷ শর্মিলা নাথের কথায়, ‘‘রণদীপের বাবা-মা চাইলেও হাসপাতালে ফোন করে এই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন না৷ ডাক্তার যদি মনে করতেন, তা হলে কথা বলা যেত৷ শনিবারই আমরা বিধাননগর দক্ষিণ থানায় ডাক্তার রূপেন্দ্রকুমার ব্রহ্ম এবং ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে রণদীপকে মেরে ফেলার অভিযোগ করেছি৷’’ ডাক্তার প্রথমে বলেছিলেন, চিকিৎসার জন্য দুই সপ্তাহে ২৫ হাজার টাকা খরচ হবে৷ কিন্তু, শেষ পর্যন্ত ৮৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে৷ এ কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘এখনও পর্যন্ত রণদীপের চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনও নথি হাসপাতাল থেকে আমাদের দেওয়া হয়নি৷ আজ সকালে ওই সব নথি পুলিশকেও প্রথমে দেওয়া হচ্ছিল না৷’’ হাসপাতাল থেকে রণদীপ বসুর মৃতদেহ ছাড়তে এ দিন বিকেল সাড়ে তিনটে বেজে যায়৷ আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে পোস্ট মর্টেম হয়েছে৷ শর্মিলা নাথের আশঙ্কা, ‘‘ডাক্তার রূপেন্দ্রকুমার ব্রহ্ম আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন৷ রণদীপকে যেভাবে মেরে ফেলা হল, তাতে পোস্টমর্টেম রিপোর্টে এই ডাক্তারের কোনও হস্তক্ষেপ থাকবে না তো!’’
কী বলছেন অভিযুক্ত এই ডাক্তার? তাঁর মোবাইলে ফোন করে জানতে চাওয়া হয়, ডাক্তার আর কে ব্রহ্ম বলছেন…? ফোনের ওপার থেকে বলা হয়, ‘‘ইয়েস৷’’ আপনার বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলায় এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় বিধাননগর দক্ষিণ থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে…৷ কিন্তু, ফোনের ওপার থেকে এ বার আর কোনও উত্তর আসে না৷ তবে, কয়েক সেকেন্ড পরে ফোনের ওপারে অন্য একজন কথা বলতে শুরু করেন৷ তাঁকে বলা হয়, এই অভিযোগের বিষয়ে ডাক্তার রূপেন্দ্রকুমার ব্রহ্মর বক্তব্য জানতে চাইছি…৷ ফোনের ওপার থেকে ১০ মিনিট পরে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বলা হয়৷ কিন্তু, পরে বহুবার ফোন করা হলেও, অভিযুক্ত ডাক্তারের সঙ্গে আর কথা বলা সম্ভব হয়নি৷ শনিবার সন্ধ্যার পরে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে ওই চিকিৎসাকেন্দ্রে ফোন করা হলে সেখানকার রিসেপশন থেকে বলা হয়, ‘‘যাঁরা কথা বলবেন, এখন তাঁরা সবাই বেরিয়ে গিয়েছেন৷ রবিবার ছুটি৷ সোমবার ফোন করলে পাওয়া যাবে৷’’


আরও পড়ুন: মমতার আইন বাতিলের দাবিতে পথে নামছেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী


আরও পড়ুন: ম্যালেরিয়া মুক্ত দেশের লক্ষ্যে মমতাকে পিছনে ফেলে দিলেন মোদী


আরও পড়ুন: রোগনির্ণয়ে দেরি হবে না সরকারি হাসপাতালে, প্রত্যাশায় তৃণমূলের সংগঠন


 

Advertisement
---