ক্ষমতার লড়াইয়ের আড়ালে থেকেই যাচ্ছে ভোট সন্ত্রাস আর হিংসা

কুমারেশ হালদার: অবশেষে বৃহস্পতিতেই মিটল বাংলা ভোটের নবান্ন দখলের লড়াই৷ বৃহস্পতিতে ভোট মিটলে ফের লক্ষ্মীবারে মিলবে ভোটের ফলাফল৷ ১৯ মে৷ নবান্ন দখলে নেবে নয়া সরকার৷ টানা ৩৫ দিন ধরে চলেছে বাংলার বৃহত্তম ভোট উৎসব৷ আর সেই ভোটের দফা যত এগিয়েছে ততই ‘দফারফা’ হয়েছে ভোটের বাংলা৷ নির্বাচন মিটতে না মিটতেই সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছে হিংসা-সন্ত্রাসের খবর৷ শহর থেকে জেলা, শাসক-বিরোধী দলের ‘আক্রমণে’র শিকার হয়েছেন শতাধিক মানুষ৷ আক্রান্ত হয়েছে শৈশব৷ হালিশহর, ভাঙড়, হরিদেবপুর, বিষ্ণপুর ও শেষ দফায় তমলুকে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রকে লোহার রড দিয়ে মারধরেরও অভিযোগ ওঠে৷ বাড়ি ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ-বোমা-গুলি-অঙ্গহানি-মারধরের ঘটনা অব্যাহত৷ এখনও পর্যন্ত ভোট পরবর্তী হিংসায় প্রাণ গিয়েছে ছয় জনের৷ মৃত্যুমিছিলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ‘বাহুবলি’দের দৌরাত্ম্য৷ শাসক দলের ‘হামলা’-বিরোধী দলের ‘প্রতিরোধ’ গেরোয় আটকে শান্ত বাংলার চেনা ছবি৷ থানায়-কমিশনে অভিযোগের পাহাড় জমেছে৷ ভোটের দিন ঘোষণার পর থেকে কমিশনে এখনও পর্যন্ত মোট ৫২ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে৷ ভোট পরবর্তী হিংসা রুখতে কমিশন ‘ব্যর্থ’ বলে অভিযোগ তুলে আদালতের হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়ে জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে হাইকোর্টে৷

প্রথম দফা: এই দফায় দুদিনে ভোট হয়েছে ৪ এপ্রিল এবং ১১ এপ্রিল৷ প্রথম দিনে ভোট পরবর্তী হিংসায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া৷ ভোট মিটতেই রাঢ়বঙ্গ থেকে উঠে আসতে শুরু করে হিংসার ছবি৷  রাজনৈতিক সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতা। স্থানীয় শুকনাতোড়ে সিপিএম-তৃণমূলের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। সিপিএমের বুথ এজেন্টকে কেন্দ্র করে দু’দলের মধ্যে প্রথমে শুরু হয় বচসা। তারপর হাতাহাতি। সংঘর্ষে আহত হন দুই তৃণমূল কর্মী। গড়বেতা থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। এই ঘটনার রেশ মিটতে না মিটতেই পশ্চিম মেদিনীপুরের দুবরাজপুরে তৃণমূলের বুথ সভাপতি জয়দেব জানাকে পিটিয়ে খুন করার অভিযোগ ওঠে কংগ্রেস কর্মীদের বিরুদ্ধে৷ বাঁশ, লাঠি ও রড দিয়ে বেধড়ক মেরে পালিয়ে যায় দুষ্কৃতীরা৷ তৃণমূল কর্মী খুন নিয়ে চড়তে থাকে রাজনৈতিক উত্তেজনা৷ সিপিএম-তৃণমূল সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বীরভূমের লাভপুর। গুরুতর জখম হন দুই সিপিএম সমর্থক৷

প্রথম দফার দ্বিতীয় দিনে পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বর্ধমানে মোট ৩১টি কেন্দ্রে ভোট শুরু হয় ১১ এপ্রিল৷ ভোট মিটতেই পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতনে সিপিএম সমর্থকদের উপর হামলা, বাড়িতে গিয়ে হুমকি, মারধরের অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে৷  জখম চার মহিলা সিপিএম সমর্থক। বর্ধমানের জামুড়িয়ার সত্তর গ্রামে সিপিএম সমর্থকদের বাড়িতে দফায় দফায় হামলার অভিযোগ উঠেছে৷ বর্ধমানের পাণ্ডবেশ্বর বিধানসভার একাধিক এলাকায় সিপিএম সমর্থক ও পোলিং এজেন্টদের হুমকি, মারধর, বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠে আসে। আহত চার। পাণ্ডবেশ্বরের বাজারপাড়া এলাকায় সিপিএম সমর্থকের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। পাণ্ডবেশ্বরেরই লাউদোহার লস্করবাঁধ এলাকায় দুই সিপিএম সমর্থককে মারধর ও বাড়ি ভাঙচুরেরও অভিযোগের খবর পাওয়া যায়৷
৪৯৪টি অভিযোগ নিয়ে প্রথম দিনের ভোট শেষ

- Advertisement -

voteদ্বিতীয় দফা:  ১৭ এপ্রিল ভোট হয়েছে দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, মালদহ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, আলিপুরদুয়ার এবং বীরভূম৷ মোট ৫৬ কেন্দ্রে ভোট করতে হিমশিম খায় কমিশন৷ ভোট শুরু হতেই ছাপ্পা-ভোট লুঠ-বুথ জ্যামের অভিযোগ আসতে শুরু করে৷  সন্ত্রাসের শিরোনামে উঠে আসে মালদহ-বীরভূম৷ বীরভূমে ১১টি কেন্দ্রে সন্ত্রাস-ছাপ্পা-ভোট লুটের অভিযোগ তুলে পুনরায় নির্বাচনের দাবিও করে বিজেপি৷ ভোট মিটতেই সন্ত্রাসের মুখে পড়ে একাধিক এলাকা৷ ভোট পরবর্তী হিংসায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সিউড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত দুবরাজপুরের পারুলিয়া পঞ্চায়েতের মাজিগ্রাম। তৃণমূলকে ভোট না দেওয়ার অপরাধে বাম কর্মী-সমর্থকদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। ১৭ তারিখ রাত থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পাড়ুই। শাসক-বিরোধী দফায় দফায় গুলি-বোমার লড়াই চলতে থাকে৷ মালদহের বৈষ্ণবনগর এলাকায় দুই বিজেপি কর্মীর গায়ে গরম তেল ঢেলে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে৷
দ্বিতীয় দফায় তৃতীয় পর্বে ভোটের হার ৮০ শতাংশ

vote-forceতৃতীয় দফা: বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, কলকাতা মিলিয়ে ৬২ কেন্দ্রে ভোট করাতে কার্যত নাকানি-চোবানি খেতে হয় কমিশনকে৷ এই নির্বাচনে সন্ত্রাসে মুর্শিদাবাদের ডোমকলের দুই বাম কর্মী ও ভগীরথপুরে এক সিপিএম কর্মীর মৃত্যু হয়৷ প্রথম ও দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে রেকর্ড ভেঙে ভোট উৎসব চলাকালীন কমিশনে জমা পড়ে ২ হাজার ৭৭৭টি অভিযোগ৷ বিক্ষিপ্ত অশান্তির আবহে ভোট পড়ে ৭৯.২২ শতাংশ৷ ভোট মিটতেই ফের শুরু হয় সন্ত্রাস৷ রাজনৈতিক হানাহানির জেরে এক সিপিএম কর্মীর মৃত্যু হয় উত্তর ২৪ পরগনার হাড়োয়া। ভোট-পরবর্তী হিংসায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে নদিয়ার কল্যাণী বিধানসভা কেন্দ্রের গয়েশপুর। সিপিএম সমর্থককে লক্ষ্য করে গুলি-বোমাবাজি চলতে থাকে৷ বোমার আঘাতে গুরুতর জখম বেশ কয়েকজন সিপিএম সমর্থক। বর্ধমানের খণ্ডঘোষে খুন করা হয় সিপিএমের পোলিং এজেন্ট ফজল হক সহ দুজনকে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে দুই সিপিএম কর্মীকে মারধরের অভিযোগ তৃণমূলের বিরুদ্ধে। ভোট-পরবর্তী হিংসা ছড়িয়ে পড়ে নদিয়ার হরিণঘাটায়। আক্রান্ত হন সিপিএম নেতা ও প্রাক্তন পঞ্চায়েত প্রতিমন্ত্রী বঙ্কিম ঘোষ, প্রাক্তন বিধায়ক ননী মালাকার সহ আরও কয়েকজন সিপিএম নেতা-কর্মী। কাশীপুর-বেলগাছিয়া বিধানসভা অঞ্চলে ভোটারদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে শাসক দলের বিরুদ্ধে৷ এমনকি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের কেন্দ্র কালীঘাটেও উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘দাদাগিরি’র অভিযোগ। তৃণমূল প্রার্থীর ঘনিষ্ঠ দুই নেতার বিরুদ্ধে বেলেঘাটা কেন্দ্রে সিপিএম কর্মীদের বাড়িতে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ ওঠে। দক্ষিণ হাওড়া বিধানসভা এলাকায় প্রচারের সময় সিপিএম সমর্থকদের মারধরের অভিযোগও আসে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। নদীয়ার কল্যাণী বিধানসভা কেন্দ্রের গয়েশপুরে সিপিএম সমর্থককে লক্ষ্য করে গুলি-বোমাবাজির ঘটনায় আঘাতে গুরুতর জখম হন বেশ কয়েকজন সিপিএম সমর্থক।
বিক্ষিপ্ত অশান্তির আবহে ভোট পড়ল ৭৯.২২ শতাংশ

banglar-voteচতুর্থ দফা: উত্তর ২৪ পরগনা, হাওড়া মিলিয়ে ৪৯ কেন্দ্রে মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ ভোট করাতে সক্ষম হয় কমিশন৷ যদিও দুই জেলা জুড়ে কমিশনে জমা পড়েছে অন্তত আড়াই হাজার অভিযোগ৷ নির্বাচনের সময় বিক্ষিপ্ত কিছু অশান্তির খবর পাওয়া গেলেও ভোট মিটতে তীব্র আকার নেয় সন্ত্রাস৷  ভোট-পরবর্তী হিংসায় উত্তপ্ত হয়েছে হুগলির হালিশহর৷ এখানকার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দত্তপাড়ায় আক্রান্ত হন দুই তৃণমূল কংগ্রেস কর্মী৷ উত্তর২৪ পরগনার নৈহাটিতেও সন্ত্রাস ছড়িয়েছে। আম্রপালি পল্লিতে এক সিপিএমের পোলিং এজেন্টের উপর চড়াও হয় দুষ্কৃতীরা। ভাঙচুর করা হয় তাঁর বাড়ি। উত্তপ্ত হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরও৷ এলাকার খোসালপুরে বেশ কয়েকটি বাড়িতে ভাঙচুর ও মারধরের অভিযোগ ওঠে সিপিএম সমর্থকদের বিরুদ্ধে। ভোট-পরবর্তী হিংসা অব্যাহত হাওড়ার গ্রামীণ এলাকায়। ভোটের পর রাতেই আমতার খোসালপুর ও পাঁচলায় সিপিএমের কর্মী-সমর্থকদের বাড়িতে চড়াও হয়ে হামলার অভিযোগ উঠে তৃণমূলের কর্মী সমর্থকদের বিরুদ্ধে।
চতুর্থ দফার নির্বাচন

voteপঞ্চম দফা: ৩০ এপ্রিল দক্ষিণ ২৪ পরগনা, কলকাতা, হুগলি মিলিয়ে মোট ৫৩টি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোট করায় কমিশন৷ পঞ্চম দফায় কমিশনের কড়াকড়িতে বিক্ষিপ্ত অশান্তির মধ্যেই শেষ হয় ভোটগ্রহণ পর্ব৷ কমিশনে ২ হাজার অভিযোগ জমা পড়ে৷ ভোটের দিনে সেভাবে বড় ঘটনা না ঘটলেও ভোট পরবর্তী হিংসায় উত্তপ্ত এইসব এলাকা৷ দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এক তৃণমূল কর্মী। হুগলির গোঘাটে সিপিএম সমর্থকদের বাড়িতে হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। ঘটনায় সাত বছরের এক শিশু জখম হয়। বালিগঞ্জের বেলতলা রোডে পেয়ারাবাগানের বস্তিতে একের পর এক  বাড়িতে হামলার অভিযোগে বিব্রত তৃণমূল কংগ্রেস৷ পাটুলি থানা এলাকার গাঙ্গুলিবাগানের ফুলবাগান রোড সি ব্লক, জি ব্লকের এলাকা জুড়ে তাণ্ডবের খবর পাওয়া গিয়েছে৷ টালিগঞ্জ লাগোয়া হরিদেবপুরেও ভোটের আগের রাতেই এলাকার অন্য কয়েকজন দুষ্কৃতীদের হাতে মার খেতে হয়েছে বছর দশেকের প্রীতিকেও। ভোট-পরবর্তী হিংসার খবর এসেছে বেহালার ৯১ নম্বর ওয়ার্ডের বৈকুণ্ঠ ঘোষ রোডেও৷ যাদবপুর কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থী সুজন চক্রবর্তীর নির্বাচনী এজেন্টের উপর হামলা চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ৷ ভোট-পরবর্তী হিংসার জেরে গভীর রাতে সিপিএমের যুব নেতা মানস হালদারের পোলট্রি ফার্মে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ৷ প্রায় এক লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলেও দাবি করা হয়৷ রাতের অন্ধকারে পোলট্রি ফার্মে আগুনের ঘটনায় এবার আরও বড় ক্ষতির আশঙ্কা করাছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ৷ তাদের অনুমান, ইতিমধ্যেই বোরো ধান ঘরে তুলেছেন চাষিরা৷ ভোটের আক্রোশও পড়তে পারে চালের গুদামে৷ বেহালা, যাদবপুর, ভাঙড়, কলকাতা, বারুইপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তী সহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষের খবর পাওয়া গিয়েছে৷
পঞ্চম দফা নির্বাচন

vote2শেষ দফা: বৃহস্পতিবার পূর্ব মেদিনীপুর ও কোচবিহারের মোট ২৫ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ চলে৷ বিক্ষিপ্ত ঘটনা ছাড়া মোটের উপর শান্তিপূর্ণ ষষ্ঠ দফার সপ্তম দিনের ভোট৷ ভোটের দিনে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে কোচবিহারে৷ সকাল থেকে দফায় দফায় বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন নাটাবাড়ি ও দিনহাটা কেন্দ্রের দুই তৃণমূল প্রার্থী৷ তৃণমূলের দুই দাপুটে নেতা উদয়ন গুহ ও রবীন্দ্রনাথ ঘোষের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের নির্দেশ দেয় কমিশন৷ বুথে ঢুকে ভোটকর্মীকে ‘দেখে নেওয়া’র হুমকি দেওয়ার অভিযোগে রবীন্দ্রনাথ ঘোষের বিরুদ্ধে এফআইআর ও অন্যের ভোট নিজে দেওয়ার অভিযোগে উদয়ন গুহের বিরুদ্ধেও এফআইআর দায়ের নির্দেশ দেয় কমিশন৷ পূর্ব মেদিনীপুরে একছত্র ভোট করে তৃণমূল৷ পূর্ব মেদিনীপুরের ময়নার ১৯৩ নম্বর বুথে কংগ্রেস নেতাকে মারধরের অভিযোগের অভিযোগ ওঠে৷ নন্দীগ্রামের কেন্দুয়ামারিতে দেদার ছাপ্পা ভোটের অভিযোগও তোলে বিরোধীরা৷ ভোটের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে হলদিয়ায় আক্রান্ত সংবাদ মাধ্যম। তৃণমূলের দুষ্কৃতী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ৷ পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুকে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রকে লোহার রড দিয়ে মারধরের অভিযোগ৷ ভোটের দিনে দুই জেলায় বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ঘটলেও, দক্ষিণবঙ্গে ভোট পরবর্তী হিংসার খবর প্রকাশ্যে আসে৷ বৃহস্পতিবার বহরমপুরে গুলিবিদ্ধ হন এক তৃণমূল নেতা। শহিদাবাদে নিজের বাড়ির সামনে থেকেই গুলিবিদ্ধ হন তৃণমূলের জেলা সম্পাদক সুবীর সরকার। তাঁকে লক্ষ্য করে পাঁচ রাউন্ড গুলি চালায় দুষ্কৃতীরা।  এদিন দুপুরে মালদহের কালিয়াচকে গুলিবিদ্ধ হন দুজন কংগ্রেস নেতা৷ গুলি চালায় তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরা, এমনই অভিযোগ কংগ্রেসের৷ শহর কলকাতার বেহালায় প্রাক্তন বিধায়কের বাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে৷ খোদ শহর কলকাতায় বিরোধী দলের হয়ে ভোট করাতে গিয়ে আক্রান্ত বিরোধীরা৷ প্রথম থেকে শেষ দফা, ভোট-পরবর্তী হিংসা রুখতে কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বহুবার সন্তোষ প্রকাশ করেছে বিরোধীরা৷

কিন্তু, কেন এই সন্ত্রাস? চেনা শান্ত বাংলা হঠাৎ জ্বলছে কেন? নবান্ন দখলে রাখতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে চলা তৃণমূল কংগ্রেস কেন মরিয়া?  ‘আতঙ্কের’ কারণ অবশ্যই আছেই৷ অনেকেই বলছেন, ভোটের মুখে শাসক শিবিরের ‘নারদ অস্বস্তি’, ২০১৩-র বৈশাখে ‘সারদা কেলেঙ্কারি’, নির্বাচন ঘোষণার মুখে ‘রেশন সমস্যায়’ জর্জরিত তৃণমূল৷ বাম-কংগ্রেস জোট, বিজেপির উত্থান৷ জেলে থাকা ‘প্রভাবশালী’ নেতার টিকিট দেওয়া, দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, গোঁজ প্রার্থী, প্রার্থী পছন্দ না হওয়ায় দলের অন্দরে ক্ষোভ চিন্তা বাড়িয়েছে তৃণমূলে৷ মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে কমিশনের ‘বাড়াবাড়ি’৷  সব মিলিয়ে নবান্ন দখলের লড়াইয়ে কিছুটা হলেও কোণঠাসা তৃণমূল কংগ্রেস৷ বিরোধী শিবিরে বাম-কংগ্রেস জোট শক্তি ভাবিয়ে তুলেছে তৃণমূল সুপ্রিমোকে৷ বিরোধীগড়ে ১২০টিরও বেশি সভা করেছেন তিনি৷  কখনও জোটকে, কখনও বিজেপিকে, নজিরবিহীন ভাবে আবার কখনও খোদ নির্বাচন কমিশনকে আক্রমণ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ শহরের মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজ্যে বেড়ে চলা ‘রাজনৈতিক হিংসার’ জন্য রাজনীতির থেকেও বেশি দায়ী রাজনৈতিক দলের নেতাদের ‘হিংস্র মানসিকতা’ই৷ মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সেই মতকে ঢাল করে সিপিএম ও কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের অভিযোগ, তৃণমূল নেত্রীর চাঁছাছোলা আক্রমণের জেরে আরও বেশি করে সাহস পাচ্ছে দলের ‘বাহুবলিরা’৷

mamtaগত পঞ্চায়েত ভোটে তাণ্ডব চালিয়েছে তৃণমূলের বাইক বাহিনী৷ সামান্য স্কুল ও কলেজ ভোটে ‘বাহুবলি’ লাগিয়ে ভোটে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে শাসক শিবির৷ এমনই অভিযোগ বিরোধীদের৷ যদিও সবই অস্বীকার করেছে রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল৷ পঞ্চায়েত ও পুর নির্বাচনে ভালো ফলও করেছিল তৃণমূল৷ বিশেষজ্ঞদের ধারণা, লোকসভা ভোটে ভালো ফলের জেরেই বাংলার পুরসভাগুলিতে উড়ে গিয়েছে বামেরা৷ একই অবস্থা হয়েছে পঞ্চায়েত নির্বাচনেও৷  পুরসভা নির্বাচনে ভোটের কালি বুথের বাইরে এনে ভোটারদের আঙুলে লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁ পুরসভার বর্তমান পুরপ্রধানের অনুগামীদের বিরুদ্ধে৷ এমনটাই অভিযোগ তুলেছেন বনগাঁর প্রাক্তন বিধায়ক পঙ্কজ ঘোষ৷ রাজারহাট নিউটাউন, গোপালপুর ,সল্টলেকের পুরভোটের ‘ভয়ানক’ স্মৃতি এখনও তাড়া করছে ভোটারদের৷ যদিও বিধানসভা নির্বাচনে সল্টলেক ছিল শান্ত৷ কেন্দ্রীয় বাহিনীর সক্রিয়তার ফলে বুথ লুট হয়নি৷ ব্যারাকপুর, টিটাগড়ের বহু ভোটার এবার ভোট দিতে পেরেছেন৷ সারদা-নারদা-রেশন কেলেঙ্কারি, বাম কংগ্রেস জোট, রাজ্যে বিজেপির উত্থান, ঘাসফুলকে বাড়তে দিচ্ছে না৷ সেটা ভালোই জানেন তৃণমূল নেত্রী৷ চলছে ভোট-পরবর্তী হিসাব৷ রাশি রাশি অভিযোগে বিদ্ধ মমতা তাই কি ‘ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে’ বুঝে নেওয়ার কথা বলেছেন?  ঘুরে ফিরে আসছে এই প্রশ্ন৷

এবারের ভোটে শাসকের হাতে নেই সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম ইস্যু৷ সেই সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম ঘাসফুল বেড়ে না ওঠার মূলে আগাছার উৎপাত৷ জল-সার দিয়ে চলেও, দীর্ঘস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়নি এখনও৷ সেই সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম কাঁটার সঙ্গে আছে তৃণমূলের নিজস্ব বিপদ, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব৷ ভোটের আগে গোঁজ প্রার্থী৷ তারকা প্রার্থীর ভিড়, অন্যদল ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েই প্রার্থী-পদ পাওয়ার ক্ষোভ৷ পুরানো বনাম নতুন তৃণমূলের লড়াই৷ টিভির পরদায় প্রকাশ্যে ‘টাকা’ নেওয়ায় নাম জড়িয়েছে তৃণমূলের তাবড় নেতার৷ তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বাঁ হাত’ নির্বাচনে কিছুটা ‘অচল’ হয়ে পড়েছে, তা তিনি নিজেও অনুভব করছেন৷ ফলে, ঘরে-বাইরে নিজেদের অবস্থানের আঁচ পেয়েছেন৷ বাধ্য হচ্ছেন বলতে, ‘‘কমিশন বাড়াবাড়ি করছে৷ দিল্লির সরকার নির্বাচন পরিচালনা করছে৷ রাজ্যে কি জরুরি অবস্থা তৈরি হয়েছে?’’ বৃহস্পতিবার ভোট মিটিংয়ে সাংবাদিক ডেকে সূর্যকান্ত মিশ্র মন্তব্য করেন, ‘‘প্ররোচনায় পা না দিয়ে শান্তি বজায় রাখুন৷ তারপরেও যদি অশান্তি হয়, তবে বিরোধীরাও ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়বে৷’’

তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে’ বুঝে নেওয়ার হুমকি এবং সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্রের ‘ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধে’র ডাকে আরও বিপদ বাড়ছে বাংলার৷ যুযুধান দুই পক্ষের লড়াইয়ের গেরোয় আটকে ভোটের বাংলা৷ ফের কোনও শৈশব আক্রান্ত হলে রাজনীতির ‘ফায়দা’ তুলবে শাসক অথবা বিরোধী শিবির৷

 

Advertisement
---