আজ ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’য় ইন্দ্রাণী বাগচির যে লেখা প্রকাশিত হয়েছে তাতে মালদ্বীপ যে চীনের ফাঁদে পড়েছে সে সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হয়েছে৷ কিন্তু যেটা বলা হয়নি সেটা এই যে, এই খেলাটা চীন বহুকাল আগে থেকেই চালিয়ে যাচ্ছে৷ মাও সে-তুংয়ের নীতিই ছিল, প্রাচীন চীনের যেসব সম্রাট এবং সেনাপতি আগ্রাসনে বিশ্বাসী ছিলেন তাঁদের কথা প্রচার করো৷ তাহলেই কমিউনিস্ট চীনের উগ্র জাত্যভিমান জেগে উঠবে৷ সেই কাজটাই কমিউনিস্ট চীন দশকের পর দশক ধরে চালিয়ে যাচ্ছে৷ যার প্রতিফলন জি জিনপিংয়ের আমলে আরও বেশি করে প্রকাশ পাচ্ছে৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী

ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই মাও সে-তুং এমন সব বন্ধু খুঁজে বের করেছিলেন, যারা মূলত উগ্র মতবাদে বিশ্বাসী— তায় আবার হিটলারের ভক্ত৷ যেমন সিনকিয়াংয়ের যে মুসলমান নেতাকে সামনে রেখে তিনি চীনা-ইসলামি মৈত্রী সমিতি গড়ে তুলেছিলেন তার সঙ্গে হিটলারের সাঙ্গোপাঙ্গদের খাতির ছিল৷ এই মৈত্রী সমিতি গড়ে উঠেছিল অবশ্য মাও সে-তুং পিকিংয়ের দখল নেওয়ার পর৷

এই মুসলিম নেতার মাধ্যমেই মাও সে-তুং আরব দুনিয়ায় লালচীনের প্রভাব বিস্তারের কাজটি চালিয়ে ছিলেন৷ তাতে তাঁর সুবিধাই হয়েছিল বেশি৷ তার কারণ, ইজরায়েল গঠনের সময় এবং তার পরে কিছুকাল পর্যন্ত যাঁরা ইজরায়েল-বিরোধী আন্দোলনের দায়িত্বে ছিলেন তাঁদেরও অনুপ্রেরণার উৎস ছিল অ্যাডলফ হিটলার৷ কারণ, প্যালেস্তিনীয় জঙ্গি আন্দোলনের যিনি গুরুঠাকুর তিনি নিজেই হিটলারের গ্যাস চেম্বারে বহু ইহুদিকে পুরে হত্যার কাজে নিযুক্ত ছিলেন৷

মাও সে-তুং বরাবরই আগ্রাসনের জন্য প্রাচীন চীনা সেনাপতি সুন-ৎসি’র লাইনে চলতেন৷ অর্থাৎ, তুমি যা, ভাণ করো তুমি তা নও৷ এই ভাণ নিয়েই লালচীন সেই ১৯৪৯ সাল থেকে চলছে৷ মুশকিল হল, ভারতেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনেকের মগজ ধোলাই তারা এভাবে করে ফেলেছে৷ এবং, তাঁদের মধ্যে কিছু লোক আবার এদেশের গণ্যমান্য দেশবরেণ্য৷

বিশ্বের কোথাও নতুন করে যুদ্ধ বাধুক কোনও সুস্থমস্তিষ্কের মানুষই তা চায় না৷ কিন্তু তাদের চাওয়া না-চাওয়ার উপর সব কিছু নির্ভর করে না৷ ঘটনার গতি এমনভাবে গড়ায় তাতে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়৷ না হলে, নিয়তি কেন বিধ্যতে কথাটিই হয়তো ভারতের প্রাচীন শাস্ত্রে উচ্চারিত হত না৷

সুস্থ মস্তিষ্কে যদি যুদ্ধ বন্ধের কথা পাকিস্তানের সেনাকর্তারা ভাবতেন, তাহলে পেশোয়ারের সেনা স্কুলে ভয়াবহ তালিবানি ফিদায়েঁ হামলার পরেই তাঁরা সতর্ক হতেন৷ কিন্তু সেটা তাঁরা হননি৷ উলটে, তার পরেও তাঁরা পচা চালের মধ্যে ভালো চাল খোঁজার মতো ভালো জঙ্গি, মন্দ জঙ্গির সংজ্ঞা খুঁটে বের করেছেন৷ যার জন্য পাক সামরিক গুপ্তচর বাহিনী ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) লাগাতার মদতে আফগানিস্তান ও ভারতের বুকে হক্কানি তালিবান ও জয়েশ-ই মহম্মদের মতো জঙ্গি গোষ্ঠীগুলির হামলা চলছেই৷ মাঝে মাঝে পাকিস্তানের বুকে কর্মরত চীনা বিশেষজ্ঞ ও ইঞ্জিনিয়ারদের খুন করে তারা বুঝিয়ে দিচ্ছে, একবার বেজিং যখন তাদের মদত দিয়েছে তখন সেই খেলা থেকে সরলেই সেদেশের নাগরিকদেরও গর্দান নেওয়া হবে৷

এই অবস্থাটা তৈরি হওয়ার জন্য মার্কিন প্রশাসনও অনেকখানি দায়ী ছিল৷ ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ভিয়েতনামে যখন লড়াই চলছে তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের পরামর্শদাতা হেনরি কিসিঞ্জার অত্যন্ত গোপনে ইসলামাবাদ থেকেই উড়ে গিয়েছিলেন বেজিংয়ে৷ মাও সে-তুং এবং চৌ এন-লাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে৷ উদ্দেশ্য, চলুন উভয়ে মিলে হো চি-মিনের দেশকে শায়েস্তা করি৷ কিন্তু তার আগে তো সেই গোপন যুদ্ধ চালানোর জন্য একটা জায়গা বাছতে হবে৷ সেই গোপন রণক্ষেত্রটিই ছিল লাওস এবং কম্বোডিয়া৷

পিং পং ডিপ্লোমেসির আগেই এই বন্দোবস্তটি করা হয়ে গিয়েছিল৷ তার পর থেকে যা যা ঘটেছিল তা যে কোনও থ্রিলারকে হার মানিয়ে দেয়৷ তবে সেই তখন থেকে যে দুষ্টচক্র গড়ে ওঠে তারই আরও করাল রূপ দেখা দেয় ১৯৭৯ সালের পর, আফগান যুদ্ধের সময়৷ পাকিস্তানের মাটিতেই তৈরি হয়েছিল আন্তর্জাতিক মুসলিম সন্ত্রাসবাদের নেটওয়ার্ক৷ যার পিছনে আমেরিকার প্রশাসন, লালচীন, আরবের শেখশাহি— সকলেরই মদত ছিল৷ আর তাদের পোষা বান্দা ছিল পাকিস্তানের সেনাকর্তা জেনারেল জিয়া উল-হক৷

এখন একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়৷ পুরানো বাসি কথা পেড়ে কি কোনও লাভ আছে? কিন্তু লাভ তো নিশ্চয়ই কিছু আছে৷ যারা পুরানো কথা ভুলিয়ে দিতে চায় তাদের লাভ যে লাভের কড়ি থেকে হয় সাধারণ মানুষের তো তাতে কোনও লাভ হয় না৷ ফলে তাদের জন্যেই অনেক পুরানো কথা পাড়তে হয়৷

যেমন, আমেরিকার গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ জানে, সেই আফগান যুদ্ধের সময়েই মাও-পরবর্তী চীনের নেতাদের সহায়তায় সিনকিয়াং প্রদেশের ঠিক কোথায় কোথায় কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাসবাদীদের সাহায্য করার জন্য বেতারবার্তার টাওয়ার বসানো হয়েছিল, ১৯৮৫ সালে সিনকিয়াংয়ের কাশগড় এবং খোটানে চীনা সেনাবাহিনীর ৩০০ পরামর্শদাতা ও প্রশিক্ষক কাদের তালিম দিতেন,

কিংবা তারও আগে স্টিংগার মিসাইল কীভাবে ছুঁড়তে হয় কট্টরপন্থী মুসলিম মুজাহিদদের সেটা শেখানোর জন্য মার্কিন সেনাবাহিনীর কোন কোন অফিসার আফগানিস্তানে পদার্পণ করেছিলেন এবং এত বিপুল ‘কর্মযজ্ঞে’র জন্য পয়সাটা আরবের কোন কোন দেশ পয়সা জোগাত৷ মজা হল, খুচখাচ কিছু লোকদেখানো বিক্ষোভ ছাড়া সিপিএম পরিচালিত এই পশ্চিমবঙ্গে তখন প্রায় কোনও দলই তা নিয়ে প্রশ্ন তুলত না৷ কারণ, এ রাজ্যে বাম রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেসের বিরোধিতা করে৷ আর, ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ইন্দিরা গান্ধী তখন অকপটে কাবুল সরকারের পক্ষ নিয়েছিলেন৷ তিনি খোলাখুলিই বলতেন, আফগানিস্তানে রুশ ফৌজ না-ঢুকলে পাকিস্তান ওই দেশটির দখল নিয়ে নেবে৷ এই সত্য কথাটি বলার জন্যই তাঁকে নিহত হতে হয়েছিল কি না, সে কথা হয়তো কোনও না কোনও বাঘা ইন্টেলিজেন্সের ক্লাসিফায়েড সেকশনে রয়েছে৷

ভারত সব দেশের সঙ্গেই বন্ধুত্বের অঙ্গীকারে আবদ্ধ হতে চায়৷ কিন্তু সেই অঙ্গীকারের সূত্র ধরে কেউ যদি ভারতকে গ্রাস করতে উদ্যত হয় কিংবা ভারতকে ঘিরে একটা আধিপত্যের বলয় তৈরি করতে চায়, তাহলে তো সেটা আর মেনে নেওয়া যায় না৷ এমন দিন হয়তো আসবে যখন আপন প্রতিরক্ষার খাতিরে ভারত দীর্ঘকাল ধরে যাদের বন্ধু বলে চিনত তারা পিছনে সরে যাবে, আর নতুন নতুন বন্ধু তার পাশে দাঁড়াবে৷ হয়তো চেনা সামরিক শক্তির খাতিরে তারা নিতান্ত ক্ষুদ্র৷ কিন্তু ডেভিড বনাম গলিয়াথের গল্প যে বাস্তবে ফেলনা নয়, সেটা ইতিহাসে বারংবার প্রমাণিত হয়েছে৷

------------------------------------- ©Kolkata24x7 এই নিউজ পোর্টাল থেকে প্রতিবেদন নকল করা দন্ডনীয় অপরাধ৷ প্রতিবেদন ‘চুরি’ করা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে -------------------------------------