‌পার্থসারথি গুহ: বাঙালি, বিহারী, তামিল, তেলেগু, মারাঠি, পাঞ্জাবী, মুসলিম, হিন্দু বা খ্রিস্টান-বৌদ্ধ হিসাবে নয় আমরা কবে শুধুমাত্র ভারতীয় হিসাবে নিজেদের তুলে ধরতে পারব? ভোটও দেব একজন ভারতীয়র গর্বে গৌরবান্বিত হয়ে। আনুষ্ঠানিকভাবে আধার বা সচিত্র ভোটার কার্ডের ভারতীয়ত্ব নয়, প্রকৃত ভারতবাসীর এই সিগন্যালিং আসবে হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে। স্বাধীনতার এতগুলি বছর পরে ধর্ম, জাতি, বর্ণের সর্পিল গলি থেকে বেরিয়ে আসতে দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসাবে এই দাবি তো আমরা তুলতেই পারি।

‌বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য কথাটা সব ভারতবাসীই নিশ্চিতভাবে ছোট্টবয়স থেকে শুনে আসছে। কিন্তু সত্যিই কি নানা জাতি, ধর্মে বিভক্ত সমাজ অখণ্ড হতে পেরেছে। ওপর ওপর হয়তো একটা আস্তরণ থাকছে একতার জয়গান গেয়ে। বাস্তবে কিন্তু টুকরো টুকরো ভারতের কোলাজ আমাদের চোখের সামনে ফুটে উঠছে। রাজনৈতিক দলগুলি মুখে সবাইকে নিয়ে চলার কথা বললেও আদতে এই বিভাজনকেই স্বীকৃতি দিয়ে চলেছে। প্রাদেশিকতা রাজনীতির অঙ্গ হয়ে উঠেছে ঘুরপথে। হয়তো ইংরেজদের চাপিয়ে যাওয়া ডিভাইড অ্যান্ড রুল এখনও ভারতবাসীর রক্ত-মজ্জায় মিশে আছে বলেই এই ঘূণচক্কর থেকে মুক্তি ঘটছে না কোনওমতে।

আঞ্চলিকতা বা ধর্মের নামে সেই প্র‍্যাক্টিস জারি রেখেছেন রাজনীতির কাণ্ডারীরা। যে পশ্চিমবঙ্গকে আমরা দেশের শিল্প সংস্কৃতির ধারক বাহক বলে জানি সেও কিন্তু এই প্রবণতার শরিক হয়ে চলেছে। তাই হয়তো বিহারী সমাজের সংবর্ধনা মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী তাদের একটি সংগঠনকে তৃণমূলের শাখা সংগঠন করে নিচ্ছেন। এটা ঠিক ক্ষমতায় আসার পর বিহারের শ্রেষ্ঠ উতসব ছট পুজোয় রাজ্যের বিহারী মানুষদের ছুটির ব্যবস্থা করেছেন তিনিই। এমনকি গঙ্গার ঘাটে গিয়ে এই পার্বনে শামিল হন ফি বছর। শুধু বিহারী সমাজ বলে নয়। ধর্মীয় সংখ্যালঘু মুসলিম ভাইদের ঈদ উদযাপন থেকে খ্রিস্ট ধর্মালম্বীদের পবিত্র বড়দিন সবেতেই মুখ্যমন্ত্রীর স্বতস্ফূর্ত উপস্থিতি নিশ্চিতভাবে সম্প্রীতির বাতাবরণ গড়ে তোলে। মতুয়াদের সঙ্গে তাঁর ও সরকারের নীবিড় যোগাযোগ ও দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

পাশাপাশি, এই বার্তাও ছড়িয়ে পড়ে যে ভোট রাজনীতির চক্রব্যূহ থেকে বাদ নেই পশ্চিমবঙ্গও। লালুপ্রসাদ যাদবের আমলে বিহারে যে যাদব-মুসলিম ভোট সমীকরণের কথা বলা হত তার থেকে কোনও অংশে কম যাচ্ছে না সঙ্গীত, নৃত্য, নাটকের উর্বরভূমি বাংলা। এখানেও ভোটের নামে নানা সম্প্রদায় ও জাতের ভোটকে এক জায়গায় করতে সেই চেনা ছকেই এগোতে হয়। বাম জমানাতে অপারেশন বর্গার নামে সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রান্তিক মানুষকে পাশে পেয়েছে ততকালীন শাসক দল। তারও আগে বাংলাদেশ থেকে ভিটা মাটি ছেড়ে আসা কাতারে কাতারে উদ্বাস্তু এ রাজ্যে কমিউনিস্টদের ভোটের পুঁজি বাড়িয়েছে। আবার বিজেপি যে দেশের একটা বড় অংশের মানুষের প্রতিনিধি হিসাবে নিজেদের তুলে ধরতে চায় তাও স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে বহুদিন। তাতে ধর্মের তাস খেলতে কোনোদিন বাধেনি তাঁদের। বিজেপি বিরোধী বড় একটা অংশ আবার দেশে যে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার আমদানি করেছে তার কদর্য রূপটাও মোটেই অভিপ্রেত নয়।

এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসাবে যে বিজেপি আত্মপ্রকাশ করেছে তার শিকড় যে গো বলয়ের সেখানকার আদব কায়দা বা সংস্কৃতি যাপন করে যাঁরা তাঁদের কাছে টানার দায়বদ্ধতা হয়তো থেকে যাচ্ছে শাসক দলের মধ্যে। এমনিতে আসানসোল লোকসভা কেন্দ্রটিতে নিয়ন্ত্রক যে ভোটাররা সেই হিন্দি ভাষাভাষি তথা বিহারী মানুষদের সঙ্গে রাখতে তাই অনেক মাস্টার স্ট্রোক চালতে হয়। এসব রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার জায়গা থেকেই করতে হয় কোনও সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতানেত্রীকে।

‌কিন্তু এর পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হয় ভোট রাজনীতির এই জটিল অঙ্ক আমাদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, মনন ও সংস্কৃতিকে গুলিয়ে দেয়। এক হয়ে ওঠার পরিবর্তে বিভেদের রূপরেখাকেই আরও স্পষ্ট করে তোলে। বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য নয়, অনৈক্যই প্রকট করে তোলে।

----
--