ভবিষ্যতে ব্যাংকের সঙ্গে ভুয়ো অর্থলগ্নি সংস্থার ফারাক থাকবে তো?

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: ব্যাংকের গণেশ উল্টোলে আমানতকারীর কষ্টার্জিত জমানো টাকাটা সুরক্ষিত থাকবে তো? প্রশ্নটা সম্প্রতি আবার উঠেছে৷ কারণ সরকার যতই যুক্তি দেখাক না কেন নতুন ফিনান্সিয়াল রেজলিউশন অ্যান্ড ডিপোজিট ইনসিওরেন্স (এফআরডিআই) বিল নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন রয়েছে৷ আজকের প্রজন্ম সেভাবে পরিচিত নয় ‘ব্যাংক ফেল’ হওয়ার সঙ্গে ৷ কিন্তু স্বাধীনতার আগে বলে নয় তার পরেও বেশ কয়েক বছর এদেশে মাঝে মধ্যেই ব্যাংকে তালা পড়তে দেখা যেত ৷ সেজন্য একদিকে যেমন কাজ হারাতেন সেই ব্যাংকের কর্মীরা আবার অন্যদিকে সেখানে সঞ্চিত টাকা রেখে সর্বস্ব খুইয়ে পথে বসতেন গ্রাহক এবং আমানতকারীরা৷ তখনকার বহু গল্প উপন্যাস কিংবা সিনেমায় এই ব্যাংক উঠে যাওয়া কথা উঠে আসত ৷

ষাটের দশকের শেষে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৪টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে জাতীয়করণ করেছিলেন৷ পরবর্তীকালে আরও কয়েকটি ব্যাংককেও জাতীয়করণ করা হয়েছিল৷ ফলে সেভাবে আর এখন ব্যাংক উঠে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে দেখা যায় না ৷ তাছাড়া তেমন ঘটনা ঘটার আঁচ পেলেই কেন্দ্রীয় সরকার এবং রিজার্ভ ব্যাংককে পরিত্রাতার ভূমিকা নিয়ে নড়ে চড়ে উঠতে দেখা যায়৷ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ত্রুটিমুক্ত একথা বলা যায় না ঠিকই৷ কারণ সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকার দরুন ব্যাংকের কার্যকলাপ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয় ঠিকই৷ তবু রাষ্ট্রায়ত্ত থাকলে সরকারের একটা দায়বদ্ধতা থাকে৷ কিন্তু যেভাবে ব্যাংককে বেসরকারিকরণের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেই দায়টা সরকার এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে৷

এছাড়া সরকারি সংস্থা মানে অপদার্থ এবং বেসরকারি মানেই তা দক্ষ এমন ভাবনাটাও তো ঠিক নয়৷ কারণ মনে রাখা উচিত বহু ক্ষেত্রে লোকসানে চলা বেসরকারি সংস্থাকে বাঁচাতেই সাধারণত সরকার তা অধিগ্রহণ করত৷ বেশি দিন যেতে হবে না কয়েক বছর আগে একটি ঘটনা উল্লেখ করা যাক৷ বেসরকারি গ্লোবাল ট্রাস্ট ব্যাংক যখন লাটে উঠল তখন সেই ব্যাংককে বাঁচাতে অধিগ্রহণ করতে এগিয়ে এসেছিল রাষ্ট্রায়ত্ত ওরিয়েন্টাল ব্যাংক অফ কমার্স৷ ফলে বেসরকারি ব্যাংকের দায়ভার একটি সরকারি ব্যাংকেই তখন নিতে হয়েছিল৷ আগে যা ঘটেছে ঘটেছে কিন্তু ভবিষ্যতে কোনও ব্যাংকের তেমন কিছু অবস্থা দেখলে সরকার এবং রিজার্ভ ব্যাংক পরিত্রাতার ভূমিকায় কতটা এগিয়ে আসতে পারবে তা নিয়ে ইতিমধ্যে ধন্দ দেখা দিয়েছে ৷ তার উপর এই নতুন বিল পরিস্থিতিটা যেন আরও জটিল করে তুলছে ৷

- Advertisement -

ব্যাংক ব্যবস্থা নিয়ে নতুন বিতর্কের মূলে রয়েছে ফিনান্সিয়াল রেজলিউশন অ্যান্ড ডিপোজিট ইনসিওরেন্স (এফআরডিআই)৷ এই খসড়া বিলটির ৫২ নম্বর ধারা ঘিরে উঠেছে যত প্রশ্ন৷ কারণ সেখানে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে কোনও ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার অবস্থায় পড়লে তখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করাতে গ্রাহকের আমানতের টাকা তাঁদের অনুমতি ছাড়াই বাড়তি সময়ের জন্য আটকে দেওয়া যাবে। সেক্ষেত্রে প্রয়োজনে ওই আমানতের টাকা ওই ক্ষতিতে চলা ব্যাংকের শেয়ার, ডিবেঞ্চার, বন্ড ইত্যাদিতে রূপান্তরিত করে দেওয়া হবে। আমানতে টাকা রাখার সময়ে ব্যাংক গ্রাহককে সুদসহ আসল ফেরতের চুক্তি করলেও নয়া আইনে তা না দিয়ে একতরফা ভাবে সব কিছু শর্ত বদলে দিতে পারবে ব্যাংকগুলি।

এ ছাড়া এখন কোনও একটি ব্যাংকে যতগুলি অ্যাকাউন্টে যত টাকাই কারও থাকুক না কেন, সেই ব্যাংক ফেল করলে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত নিশ্চিত ভাবে ফেরত পেতে পারে গ্রাহক বা আমানতকারীরা৷ এর কারণ হল গ্রাহকপিছু ওই একলক্ষ টাকার বিমা করা থাকে ব্যাংকের। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হলে তার চেয়েও বেশি টাকা গ্রাহকের থাকলে সেই টাকার জন্যেও বলা চলে কেন্দ্রের অলিখিত গ্যারান্টি থাকে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, নয়া আইনে বিমার আওতায় থাকা ওই এক লক্ষ টাকাটাও আদৌ ফেরত পাওয়াটা কি এবার অনিশ্চিত হয়ে পড়বে?

এই নয়া বিল নিয়ে একদিকে যেমন সোচ্চার হচ্ছে বিভিন্ন ব্যাংক ইউনিয়ন তেমনই আবার কংগ্রেস, সিপিএম সহ বেশ কিছু বিরোধী দল৷ তাছাড়া বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমে এই বিলটি নিয়ে একই রকম আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে৷ গত অগস্ট মাসে সরকার এফআরডিআই বিলটি লোকসভায় পেশ করলেও বিরোধিতার মুখে পড়ে বিলটি খতিয়ে দেখতে যুগ্ম সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে ৷ আপাতত সংসদীয় কমিটির বিচারাধীন হলেও সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে বিলটি নিয়ে কমিটি তার সুপারিশ রিপোর্ট জমা দেবে বলেই ইতিমধ্যেই খবর রটেছে৷ ফলে ফের এই বিল নিয়ে হইচই শুরু হয়ে গিয়েছে৷ বিরোধীদের যেখানে অভিযোগ, শেষমেশ এই বিল আইন হলে, দেউলিয়া ঘোষণার মুখে দাঁড়ানো ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়ে আর একশো শতাংশ নিশ্চিত থাকতে পারবেন না মানুষ। যদিও কেন্দ্রের পাল্টা দাবি, কোনও ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা লাটে উঠলেও যাতে আমজনতার টাকা মার না খায়, তা নিশ্চিত করতেই এই নতুন আইন আনা হচ্ছে৷

নয়া এই বিলটি নিয়ে দেশজুড়ে সোরগোল ওঠায় বার বার আশ্বাসবাণী শোনাতে হচ্ছে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলিকে ৷ এই প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সমেত সমস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে তাঁদের সরকার দায়বদ্ধ। উদাহরণ হিসেবে জেটলি তুলে ধরেন, সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলিতে ২ লক্ষ ১১ হাজার কোটি টাকার শেয়ার মূলধন জোগানোর সিদ্ধান্তও সেই কারণে।

তবে শাসকের বার্তায় আগের মতো ভরসা করতে পারছে না এখন আমজনতা৷ এক বছর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশের কালো টাকা উদ্ধার এবং সন্ত্রাস দমনের নামে নোট বাতিল করলেও সেই উদ্দেশ্য সফল হয়নি৷ একদিকে সন্ত্রাসবাদীদের অশান্তি যেমন থামেনি তেমনই আবার ৯৯ শতাংশ টাকাই ব্যাংকে ফিরে এসেছে৷ ২০১৪ সালে যেখানে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ ছিল ২.৭৫ লক্ষ কোটি টাকা সেটাই এই আমলে বেড়ে হয়েছে প্রায় ১১ লক্ষ কোটি টাকা৷ গত বছরে রিজার্ভ ব্যাংক সূত্রে জানা গিয়েছিল অনাদায়ী ঋণের ২৫ শতাংশ ছিল ১২টি কর্পোরেট সংস্থার হাতে এবং তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার কথা সুপারিশ করা হলেও তা সেভাবে কার্যকর হয়নি৷ এদিকে বড় অংকের টাকার কর্পোরেট ঋণ মকুব হয়েছে৷

ফলে প্রশ্ন উঠেছে ওই অনাদায়ী কর্পোরেট ঋণের টাকা আদায় করতে কেন তৎপরতা দেখানো হল না? অর্থাৎ সরকারি মদতে এই পথে ব্যাংকে জমে থাকা সাধারণ জনগণের সঞ্চিত অর্থ লুট হয়ে যাচ্ছে ৷ তার উপর এই সরকার আরও ২.১ লক্ষ কোটি টাকা ব্যাংকে আনার ব্যবস্থা করছে ৷ যাঁরা ঋণের টাকা ফেরত দেননি সেই সব শিল্পপতিদেরই ওই টাকা ফের ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে বলেও আশংকা রয়েছে ৷ কারণ ক্ষতিগ্রস্ত কিংফিশারের পতন আরম্ভ হয়ে যাওয়ার পরেও তো ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল৷ অথচ ঋণ কি আদৌ সংস্থা বাঁচাতে কাজে লেগেছিল নাকি বিজয় মালিয়ার বিলাসবহুল জীবনযাত্রার জন্য ব্যয় হয়েছে সেই প্রশ্ন বাড়ে বাড়েই উঠেছে৷ আর তারপরে তো এক সময় বিজয় মালিয়া ঋণের টাকা না মিটিয়ে বিদেশে পালিয়েছেন৷

পিছন ফিরে দেখলে দেখা যাবে, ২০০৭-’০৮ সালে মার্কিন মুলুকে এআইজি এবং লেম্যান ব্রাদার্সের পতনের জেরে শুধু মার্কিন মুলুক নয় গোটা দুনিয়ার অর্থ ব্যবস্থা কেঁপে উঠেছিল৷ বহু ব্যাংক ও আর্থিক সংস্থায় লালবাতি জ্বলেছিল৷ যার জেরে আর্থিক ভাবে ডুবেছিলেন শুধুমাত্র ফাটকাবাজরা নন সাধারণ মানুষও ৷ তবে এটা ঠিক সেই সঙ্কট কালে ভারতের অর্থনীতি তেমন কোনও আঘাত পায়নি কারণ দেশের ব্যাংক ব্যবস্থাটার মালিকানা মোটের উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণে ছিল তখন৷ কিন্তু গত দশ বছরে সরকারের হাতে থাকা ব্যাংকের লাগামটা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে ৷ অন্যদিকে সরকারের অধীনে থাকা ব্যাংকগুলি থেকে শিল্পপতিরা ঋণের নামে অর্থ লুট করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলিকে নানা ভাবে দুর্বল করে দিচ্ছেন ৷ পরিস্থিতি যাই হোক না কেন ‘কর্পোরেট লবি’ সব সময়ই কেন্দ্রীয় সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছে ব্যাংকের সুদের হার কমানোর জন্য৷ ফলে ইতিমধ্যেই স্থায়ী আমানতে সুদের হার শুধু অনেকটাই কমেনি কোপ পড়েছে সেভিংস ব্যাংকের সুদেও৷ এর পর আবার যদি ব্যাংকে রাখা টাকাও সুরক্ষিত না থাকে তাহলে ভুয়ো অর্থলগ্নি সংস্থার সঙ্গে ব্যাংকের ফারাক থাকল কোথায়?

Advertisement
---