‘বিদ্রোহী’ জাস্টিস কারনানকে জেলে পাঠানো বিচারপতিরাই এখন ‘বিপ্লবী’

মানব গুহ, কলকাতা: ভারতে প্রথমবার একসঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলনে বসলেন সুপ্রিম কোর্টের চার বিচারপতি৷ শুক্রবার, গোটা দেশ দেখল সেই ঐতিহাসিক মূহূর্ত৷ এই সাংবাদিক সম্মেলনে ছিলেন বিচারপতি জে চেলামেশ্বর, রঞ্জন গগোই, মদন লোকুর এবং কুরিয়ন জোসেফ৷

আরও পড়ুন: সাংবাদিক সম্মেলনে দুর্নীতি নিয়ে সরব সুপ্রিম কোর্টের ৪বিচারপতি

আর গতবছরই সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ও এই চারজন বিচারপতির বিরুদ্ধেই মুখ খুলে জেল খেটেছিলেন প্রাক্তন বিচারপতি সি এস কারনান৷ বছর ঘুরতেই উল্টোপূরান৷ তাহলে কারনান কি সেই সময় সত্য বলেই জেল খেটেছিলেন? ভারতীয় বিচারব্যবস্থা ও বিচারপতিদের বিরুদ্ধে কারনানের সব অভিযোগই কি সত্য ছিল? প্রশ্ন কিন্তু উঠছে৷

- Advertisement -

শুক্রবার, সাংবাদিক সম্মেলনে চারজন বিচারপতি ভারতীয় বিচারব্যবস্থা ও মুখ্য বিচারপতি দীপক মিশ্রের বিরুদ্ধে নিজেদের ক্ষোভ উগরে দেন৷ জাস্টিস চেলামেশ্বর জানান, কখনও কখনও এমনও হয় যে দেশে সুপ্রিম কোর্টের অবস্থারও পরিবর্তন হয়৷ পাশাপাশি, বিচারবিভাগীয় কাজ এখানে ঠিকমতো না হওয়ায় ক্ষোভ ঝরে পড়ে তাঁর কথায়৷ এরকম চলতে থাকলে পরিস্থিতি যে আরও কঠিন সময়ের দিকে এগিয়ে চলেছে সে বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি৷ প্রধান বিচারপতির সঙ্গে এই ইস্যুতে কথা বললেও, তিনি কোনও কথাই শোনেননি বলে অভিযোগ তাঁদের৷

আরও পড়ুন: বিচার ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক: মমতা

বিচারপতিরা জানান, তাদের ওপর অভিযোগের আঙুল উঠুক তা তাঁরা চান না৷ এই প্রথমবার সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান বিচারপতিরা সাংবাদিক সম্মেলন করলেন৷ এই প্রথম এমন কোনও ঘটনা ঘটল দেশে৷ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধাচারণ করলেন ৪ বিচারপতি৷ সংবাদমাধ্যমকে তাঁরা জানিয়েছেন, সর্বোচ্চ আদালতের পরিচালনা সঠিকভাবে হচ্ছে না৷

রীতিমত বিদ্রোহ৷ বিপ্লব ভারতীয় বিচারব্যবস্থায়৷ কিন্তু সত্যি এটাই কি প্রথম? না, এটাই প্রথম নয়৷ প্রাক্তন বিচারপতি সি এস কারনানও মুখ খুলেছিলেন ভারতীয় বিচারব্যবস্থা নিয়ে৷ বিচারপতি কারনান মুখ খুলেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বিরুদ্ধেও৷ কাকতালীয় হলেও তাঁর বিপ্লব ছিল আজকের এই ৪ বিচারপতির বিরুদ্ধেও যাঁরা শুক্রবার বিপ্লব করলেন ভারতীয় বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে৷

আরও পড়ুন: বদলে গেছেন! মমতার বিরুদ্ধে এটা কি বললেন মুকুল?

গতবছরেই সারা বিশ্বের বিচার ব্যবস্থায় অনন্য নজির গড়েন বিচারপতি সি এস কারনান৷ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সহ সুপ্রিম কোর্টের ৮ বিচারপতির বিরুদ্ধে কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সি এস কারনান৷ সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি জে এস খেহার-সহ অন্য সাত বিচারপতির পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন বিচারপতি কারনান৷ তিনি বলেছিলেন, “ওই আট বিচারপতি SC/ST অ্যাট্রসিটিস অ্যাক্ট অফ ১৯৮৯ ও অ্যামেনডেড অ্যাক্ট অফ ২০১৫ ভেঙেছেন। তাই, ওঁদের ৫ বছরের কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হল। ”

প্রধান বিচারপতি জে এস খেহার ছাড়াও এই তালিকায় ছিলেন বর্তমান প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র, বিচারপতি জে চেলামেশ্বর, বিচারপতি রঞ্জন গগোই, বিচারপতি মদন বি লোকুর, বিচারপতি পিনাকীচন্দ্র ঘোষ, বিচারপতি কুরিয়ান যোসেফ। অর্থাৎ আজকের ৪ বিপ্লবী বিচারপতি জে চেলামেশ্বর, রঞ্জন গগোই, মদন বি লোকুর ও কুরিয়ান যোসেফের নামও বিচারপতি কারনানের অভিযোগের তালিকায় ছিল৷

আরও পড়ুন: এবার প্রজাতন্ত্র দিবসে দেশে উড়বে ১১৫ ফুটের পতাকা

সাত বিচারপতির বেঞ্চ বিচারপতি কারনানের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা দায়ের করেন৷ সেই সঙ্গে তাঁকে বিচারবিভাগীয় ও প্রশাসনিক কাজকর্ম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বিচারপতি কারনানের অভিযোগ ছিল, সুপ্রিম কোর্টের আর এক বিচারপতি আর ভানুমতি তাঁর অধিকার কেড়ে নিয়েছেন৷ উনিও প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কাজ করছেন৷

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বেঞ্চের নির্দেশ মোতাবেক গত বছরের ৪ মে বিচারপতি কারনানের বাড়িতে তাঁর মাথা খারাপের পরীক্ষা করতে মেডিক্যাল চেক আপের জন্য একটি দল আসে৷ কিন্তু, তিনি পরীক্ষা করাতে অস্বীকার করেন। এবং তাঁদের জানিয়ে দেন, তিনি পুরোপুরি সুস্থ৷

আরও পড়ুন: জঙ্গি মোকাবিলা করতে বিশেষ স্কোয়াডকে ট্রেনিং দিচ্ছে NSG কমান্ডোরা

এরপরই, ২০১৭ সালের ৮ ই মে বিচারপতি কারনান আট বিচারপতির বিরুদ্ধে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন। সেইসঙ্গে তিন ধাপে ১ লাখ টাকা জরিমানা দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়। অনাদায়ে আরও ৬ মাস কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন। জরিমানার টাকা ১ সপ্তাহের মধ্যে ন্যাশনাল কমিশন, SC/ST কনস্টিটিউশনাল বডির কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

সেই সঙ্গে বিচারপতি কারনান আরও নির্দেশ দেন, সাত বিচারপতির বেঞ্চের বিরুদ্ধে ১৪ কোটি টাকা জরিমানার যে অর্ডার তিনি পাশ করেছিলেন তাও বলবৎ থাকবে। তাঁদের মাইনে থেকে সেই টাকা কেটে নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়। বিচারপতি ভানুমতিকে ২ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দেন বিচারপতি কারনান।

আরও পড়ুন: ট্রাম্প-জিংপিংকে পিছনে রেখে আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় সেরা মোদী

ভারতের বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থায় সেটাই ছিল প্রথম বড় বিপ্লব৷ ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম যেখানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের, নিম্ন আদালতের এক বিচারপতি কারাদণ্ডের আদেশ দেন৷ নড়েচড়ে বসেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা৷

এরপরেই সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বিরুদ্ধে সমস্ত রায় খারিজ করে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সিএস কারনানকে ছ’মাসের কারাদণ্ড দেয় সুপ্রিম কোর্ট৷ গত বছরের ৯ মে এই যুগান্তকারী রায় দেওয়া হয়৷ এর পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমে তাঁর বক্তব্য প্রকাশ্যে আনার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়৷ এ রাজ্যের ডিজি সুরজিৎ কর পুরকায়স্থকে আদেশ দেওয়া হয় একটি বিশেষ টিম গঠন করে তাঁকে শীঘ্র হেফাজতে নেওয়ার জন্য এবং তার জন্য যা পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন তা নিতে৷

আরও পড়ুন: দেশের সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োজন: রাওয়াত

মাসখানেকের মধ্যেই তাঁকে কোয়েম্বাটুর থেকে গ্রেফতার করে রাজ্য পুলিশের বিশেষ দল৷ তাঁকে প্রেসিডেন্সি জেলে রাখা হয়৷ প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের প্রাক্তন বিচারপতি হিসেবে ছ মাস প্রথম শ্রেণীর বন্দির মর্যাদায় কাটান কারনান৷ ২১ জুন থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্য়ন্ত জেলেই কাটান ভারতীয় বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে মুখ খোলা কোন বিচারপতি৷

আর শুক্রবার সেই বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধেই মুখ খুললেন বিচারপতি কারনানের বিরোধীতা করা অন্যতম সেই ৪ জন বিচারপতি৷ ভারতীয় বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে প্রাক্তন বিচারপতি সি এস কারনান ছমাসের জেল খাটেন৷ সেই একই বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সরব হওয়া এই চার বিচারপতির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয় সুপ্রিম কোর্ট, সেটাও এখন দেখার৷

আরও পড়ুন: ‘ভারত কিন্তু দুর্বল নয়’, চিনকে হুঁশিয়ারি সেনাপ্রধানের

প্রশ্ন কিন্তু অন্য৷ তাহলে কি ভারতীয় বিচারব্যবস্থা ও তার বিচারপতিদের বিরুদ্ধে মুখ খোলা বিচারপতি কারনান সেদিন সঠিক ছিলেন? সঠিক কথা বলেই কি সেদিন জেলে গিয়েছিলেন বিচারপতি কারনান? প্রশ্ন কিন্তু উঠছে৷

Advertisement ---
---
-----