এ ছিল এক অন্য স্বাধীনতা

সুপর্ণা সিনহা রায়, রানাঘাট: ১৫ই অগস্ট দিনটাকে একটু অন্য ভাবে কাটালেন এঁরা৷ এঁদেরও অধিকার আছে স্বাধীন নাগরিকের মত বাঁচার৷ যেখান থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার কথা ছিল সেখান থেকে না পেলেও তার স্বাদ দিলেন রাজীব বিশ্বাস৷ রাণাঘাটের শ্রীনগর পাড়ায় সমাজসেবা কেন্দ্র রাণাঘাট প্রকৃতির আলোকে নিয়ে একাই লড়ে চলেছেন রাজীব৷ এঁদের নিয়ে৷ একলা চলোর নীতি নিয়েই৷ কেউ নেই সঙ্গে তো কি হয়েছে! ইচ্ছে যখন আছে উপায়ও তখন আছে৷ তাই সক্কাল সক্কাল স্নান সেরে পরিষ্কার জামাকাপড় পড়ে সকলে হাজির পতাকা উত্তোলন করতে৷

এঁদের মধ্যে কেউবা রাস্তায় হাত পেতে ভিক্ষা করে কেউ মানসিক ভারসাম্যহীন তো কেউ বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে বাড়ি থেকে বিতাড়িত৷ ভার হালকা করা তো দূর পরিবার বয়সের ভার উপেক্ষা করেই নিজের পেট চালানোর ভারটাও এঁদের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েই স্বাধীন হয়েছে৷ আজ স্বাধীনতা দিবসে তাদের পরিবারের লোকেরা ঘুম ভেঙে দেশমাতৃকার গান গাইছে কিনা বলা সম্ভব নয় কিন্তু এঁরা তৈরি৷ সকলে শাড়ি জামাকাপড় পেয়ে বেশ উচ্ছসিত৷ কেউ কেউ তো আবার কোন রঙের শাড়িটা নেবেন সেই নিয়ে আবদারও জুড়লেন৷

- Advertisement -

এর মাঝেই একজনকে প্রশ্ন করা হল স্বাধীনতা মানে বোঝেন? আপনি কি স্বাধীন? জবাব এল “নিজের বাড়িতে থাকতে পারি না৷ আমার বাড়ি থেকেই আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে৷ কিসের স্বাধীনতা?” আরেক যুবককে প্রশ্ন করা হল কেমন লাগছে নতুন জামাকাপড় পেয়ে? একগাল হাসি নিয়ে সে জানায় “খুব ভাল লাগছে৷ পরের জামাকাপড় পরে থাকি৷ এটা আমার নিজের৷” সেও বাড়ি থেকে বিতাড়িত৷ কেন তাড়িয়ে দিয়েছে জানতে চাইলে সে জানায় “জানিনা কেন তাড়িয়ে দিয়েছে৷ সবাই পাগল বলে৷ আমি পাগল নই৷”

কী পাপে তারা আজ ঘর ছাড়া তার উত্তর কারো কাছেই নেই৷ তবে একটা দিন এই সব রাস্তার পরিবার মিলে আজ একটা পরিবার হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ সেই পরিবারই স্বাধীনতার খানিকটা স্বাদ পেল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত৷ তারপর অবশ্য কে কোথায় চলে গেল কেউ জানে না৷ রাতে যেখানে থাকে সেই স্টেশন চত্বরে দুপুরে আর তাদের দেখা মেলেনি৷ নিরাপত্তার কড়াকড়িতে তাদের এদিন স্টেশন চত্বরে থাকতে দেওয়া হয়নি৷ তাই এ পাডা় ও পাড়া ঘুরেছে হয়ত সারা দিন৷ সকাল আর দুপুরের খাবারে পেট ভরে নতুন জামা কাপড় পড়ে ঠাকুর দেখার মত করেই পাড়ায় পাড়ায় উড়তে থাকা পতাকা দেখে বেড়িয়েছে হয়ত৷ তারপর রাত বাড়লে আবার কোনও অনির্দিষ্ট আশ্রয়ে মাথা গুঁজেছে৷

১৫ই অগস্টের শুভ দিনে এঁদের প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয় নতুন বস্ত্র৷ হাতে বেঁধে দেওয়া হয় রক্ষাকবচ৷ রাখী৷ সুসম্পর্কের শুরু হয়েছে অনেক আগেই৷ এদিন যেন এই রাখী সেই অঙ্গিকারে শিলমোহর দিল৷ আরও একটা বার্তা দিল আগামী প্রজন্মকে৷ তারাও বড় হবে৷ সবারই বয়স বাড়ে৷ তাদের বাবা মাও ততদিনে ন্যুব্জ হবেন বয়সের ভারে৷ ছোটরা যেন আগামীতে এ ভুল না করে৷ রানাঘাট শ্রীনগর পাড়ায় এই পতাকা উত্তোলনে কোনও ভিআইপিকে ডাকা হয়নি৷ আজ এঁরাই ভিআইপি৷ পতাকা উড়ল এঁদের হাত ধরেই৷ পেট পুরে খেতে দেওয়া হল ভাত ডাল চিপস সবজি মাংস৷ যাঁরা নিরামিষ খান তাঁদের জন্য ছিল পনির৷ শেষ পাতে মিষ্টি মুখ৷ সামান্য কিছু টাকাও তুলে দেওয়া হয় এঁদের হাতে যাতে আজকের দিনটায় কারো সামনে ভিক্ষার জন্য হাত পাততে না হয়৷

কোনও বয়স্ক মানুষ নিজের পছন্দের কোনও খাবার কিনে খেতে পারেন৷ ধন্য হলেন ধরিত্রী৷ অন্য বস্ত্র বাসস্থান নাগরিকের অধিকার৷ কেউ সেই অধিকার কেড়ে নিতে জানে৷ আবার কেউ জানেনা৷ তাদের আশ্রয় হয় রাস্তার ধার৷ সেখান থেকেই তুলে এনে নতুন জীবনের স্বাদ দিতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন রাজীব৷ আজ স্বাধীন ভারতে এঁদের হাতেই পতাকার দায়িত্ব৷

এই সব নিজে দায়িত্ব নিয়ে যিনি করলেন সেই রাজীব বিশ্বাস জানান “কাজ করতে গিয়ে তিন ধরণের সমস্যা দেখতে পাওয়া যায়৷ এক, যাঁরা বয়স্ক মানুষ তাঁদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় তাঁদেরই সন্তান৷ দুই, মানসিক ভারসাম্যহীন কিছু লোক নিজেরাই হয়ত বেড়িয়ে পড়েন রাস্তায়৷ আর বাড়ি ফিরে যেতে পারেননা৷ তাদের মধ্যে কারো কোনও আঘাত থেকে ঘা হয়ে যায়৷ চিকিৎসা না হওয়ায় সেখানেই ম্যাগট হয়ে যায়৷ আরও একটা সমস্যা খুব বড়৷ কিছু মানসিক ভারসাম্যহীন কম বয়সী মেয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেই তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন হয়৷ তারা অনিচ্ছাকৃত অন্তঃসত্বা হয়ে পড়ে৷ এদের দেখার কেউ নেই৷ চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হয়৷ এদের৷

তিন, কিছু ছোট ছোট ছেলেমেয়ে আছে যাদের বাবা মা ছেড়ে চলে গিয়েছে তাদের৷ পড়াশুনা করবে কি ভিক্ষা করে পেট চালাতে হয়৷ থাকার কোনও জায়গা নেই এই তিন শ্রেনীর মানুষ গুলোরই৷ এঁদের জন্য চাই একটা স্থায়ী আশ্রয়৷ যা করার চেষ্টা করে চলেছি৷ কিন্তু একা পেরে উঠছিনা৷ যদি সহৃদয় ব্যক্তিরা একটু একটু করে সাহায্য করেন তাহলে হয়ত একদিন এই মানুষগুলোর জন্য স্থায়ী আশ্রয় তৈরি করা সম্ভব হবে৷”

স্বাধীনতা দিবস মানে তো সবার স্বাধীনতা৷ তাহলে এঁরা কি দোষ করেছে? কেন নিজের বাড়ি থাকতেও সেখানে থাকতে পারবেনা? কি দোষ করেছে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে এঁরা? দোষীদের শাস্তি দেয় আইন৷ এঁরা দোষ না করেও কিসের শাস্তি ভোগ করছে? স্বাধীনতা কোথায়? তবু৷ হ্যাঁ তবু৷ স্মৃতির পাতার জমাটি রক্ত বুকে নিয়ে এঁরাই হাসি মুখে তুললেন পতাকা৷ তাতেও কি পাষাণ মন গলবে কারো? না গলুক৷ স্বাধীনতা দিবসের দুপুরের নতুন জামা ভাত মাংস আর পনিরের আনন্দ সেই দুঃখ ধুয়ে মুছে দিয়ে যাক৷

Advertisement
---