আমাকে ওরা মেরে ফেলতো…বললেন বাসুদেব আচারিয়া

একটা সময় ছিল, যখন রাজ্যের বামফ্রন্টের নেতারা উত্তর থেকে দক্ষিণ, কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ চষে বেড়াতেন৷ ব্যস্ততার মধ্যেই দিন-রাত কাটত৷ কিন্তু রাজ্যপাট হাতছাড়া হতেই তাদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে৷ কেউবা নিজেকে আড়াল করে নিয়েছেন৷ কেউ করেছেন দলবদল৷ কিন্তু কিছু কমরেড এখন ঠিক কী করছেন? কী করে তাঁদের দিন কাটছে৷ সেই সব নিয়ে Kolkata24x7 এ বিশেষ ধারাবাহিক প্রতিবেদন #কেমন_আছেন_কমরেড?

দেবময় ঘোষ, কলকাতা: ‘‘আমি সুস্থ নই৷ ওরা আমাকে আরও মারত৷ মেরেই ফেলতো …৷ পেটে এখনও যন্ত্রণা করে৷ তিন দিন হাসপাতালের আইসিইউ তে ছিলাম৷ পরে এইমসে্ ভর্তি হয়েছিলাম৷’’ ৭৬ বছরের কমরেড বাসুদেব আচারিয়া যখন রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচনে তাঁর ভয়ার্ত অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন, তখন ভয় নয়, প্রতি শব্দে ঘৃণা ঝড়ে পড়ছিল৷

৬ এপ্রিল আক্রান্ত হন বাঁকুড়ার ৯ বারের সাংসদ এবং সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বাসুদেব৷ পুরুলিয়ার কাশিপুর ব্লকে পঞ্চায়েতের মনোনয়ন জমা দিতে বিডিও অফিসের দিকে দলীয় কর্মীদের নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি৷ পথ আটকে গুন্ডাবাহিনী তাঁকে মাটিতে ফেলে লাঠি দিয়ে মারতে থাকে৷ পেট ও পাঁজরে মারাত্মক আঘাত লাগে বৃদ্ধ কমরেডের৷ রক্তাক্ত হন দলের অন্যান্য কর্মীরাও৷ তৃণমূল অবশ্য দায় নেয়নি৷
‘‘পঞ্চাশ বছর সক্রিয় রাজনীতিতে আছি৷ একজন জনপ্রতিনিধি আমি৷ নিজের রাজ্যে কখনও এভাবে মার খাব ভাবিনি৷ (সাংসদ থাকাকালীন) কয়েকশো লোক প্রতিদিন বাড়িতে আসতো৷ কখনও কাউকো জিজ্ঞাসা করিনি যে তিনি কোন দল করেন৷

৩৪ বছর সংসদে ছিলাম৷ সংসদের একাধিক কমিটির চেয়ারম্যান ছিলাম ১৯৮৯ থেকে৷ আইএএস, আইপিএস, আইএফএস-দের Probationary Period চলাকালীন Role of Parliamentary Committee on Parliamentary Democracy নিয়ে লেকচার দিয়েছি৷ কখনও ভাবিনি আমাদের রাজ্যে এই অরাজকতা আর লুঠ চোখে দেখব৷’’ এক নিঃশ্বাসে বলে চললেন বাসুদেব৷

‘‘যারা মারছিল, তাদের মধ্যে অনেকেই আমাকে চেনে৷ একজন তো আমার পাড়ারই লোক৷ আদ্রার কাটারাঙুনি গ্রামে বাড়ি৷ বাকিদের ও-ই আটকালো৷ নয়তো আমাকে ওরা মেরে ফেলতো…,’’ বলেন বাসুদেব৷ ৭১ সালে পুরুলিয়া জেলা কমিটিতে যোগ দেন বাসুদেব৷ আশি সালে প্রথম বাঁকুড়ার সাংসদ হন৷ পঁচাশি সালে জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য হন৷ বললেন, ‘‘গত কয়েক বছরধরেই রাজ্যে অরাজকতা চলছে৷ কিন্তু পরিস্থিতি এতো নীচে নামবে ভাবা যায়নি৷ বিডিও অফিস ঘেরাও করেছিল তৃণমূল৷ জেলাশাসক আমাকে বলেছিল এখানে ১৪৪ ধারা আছে৷ তবুও ঝান্ডা হাতে মনোনয়ন জমা দিতে গিয়েছিলাম৷’’

বয়সের ভারে আর বৃদ্ধ বয়সে তৃণমূলের মারে অসুস্থ বাসুদেব৷ বললেন, ‘‘দেড়-দুই বছর ধরেই অসুস্থ আমি৷ শরীর একদম ভালো যাচ্ছে না৷ এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারি না৷ সিআইটিইউ-অর অন্যতম সহ সভাপতি আমি৷ বুধবারই দিল্লিতে কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে যাব৷ এছাড়া (সিপিএমের) রাজ্য কমিটিতে আমি বিশেষ আমন্ত্রিত৷ কেন্দ্রীয় কমিটিতেও Ex-Officio Member হিসেবে রয়েছি৷ ২০-২২ দিন নিজের বাড়িতে থাকি৷ আবার হায়দরাবাদেও যাই৷ ওখানে চিকিৎসা চলছে৷ ছেলে, মেয়ের কাছে থাকি৷ জেলা অফিসেও যাই৷’’

২০১৪ সালে তৃণমূল প্রার্থী অভিনেত্রী মুনমুন সেনের কাছে তাঁর হারাটা পার্টি ও পার্টির বাইরে অনেকেই মেনে নিতে পারেনি৷ অবাক হয়েছিলেন অনেকেই৷ কিন্তু হার টলাতে পারেনি বাসুদেবকে৷ মুনমুন পেয়েছিলান ৩৯.১০ শতাংশ ভোট৷ ৯ বারের সাংসদ বাসুদেব পান ৩১.০৫ শতাংশ ভোট৷ ১৬.৬১ শতাংশ ভোটের ঘাটতি কীভাবে হল তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে বাসুদেব দেখেছিলেন, বিজেপি প্রার্থী সুভাষ সরকারের দিকে তাঁরই ১৫ শতাংশ ভোট চলে গিয়েছে৷ বাঁকুড়ায় ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর জনসভা মানুষের মনে প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে, তা পরোক্ষে মেনেছেন কমরেড৷ ‘‘ডিলিমিটেশনের পর এলাকার প্রতিটি জায়গায় ঘুরেছিলাম৷ নিজের কেন্দ্রে রেল যোগাযোগ নিয়ে কী কাজ করেছি, তা মানুষ জানে৷ বিজেপি এখানে তৃণমূলকে সুবিধা করে দিয়েছিল,’’ জানালেন বাসুদেব৷

রাজ্যে বামফ্রন্টের ক্ষমতা ক্ষয় হয়েছে৷ পরিস্থিতি প্রতিকূল, তা মানেন বাসুদেব৷ নিজেই জানালেন, রাজ্যে পার্টির সদস্য সংখ্যা দিন দিন কমছে৷ ‘‘সে এক দিকে ভালো৷ সুযোগসন্ধানীরা চলে গিয়েছে৷ তবে চিন্তার কারণ, পার্টিতে নিষ্ক্রিয়তা বাড়ছে৷ এটা আগে কখনই ছিল না৷ কমরেডদের উপলব্ধি নেই, আন্তরিকতার অভাব৷

২০০৪ থেকে ২০০৯, সিপিএমের সংসদীয় দলের নেতা বাসুদেব৷ লোকসভায় অধ্যক্ষের আসনে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়৷ ২০০৮ এর মাঝেই ইউপিএ-এর সঙ্গ ত্যাগ করল সিপিএম৷ পার্টির যে সাংসদরা সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দিতে তৈরি হচ্ছিলেন, তাঁদের মধ্যে সোমনাথবাবুর নাম রাখা হয়৷ আস্থা ভোটে সোমনাথবাবু ইউপিএ-এর বিরুদ্ধে ভোট দেননি, কারণ ইউপিএ-এর বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার অর্থ ছিল বিজেপি-কেই সমর্থন জানানো৷

সে দিনগুলির কথা মনে করে বাসুদেবের বক্তব্য, ‘‘সেই সময় কেন্দ্রীয় কমিটি সোমনাথবাবুকে পার্টি থেকে বহিষ্কারের সিদ্দান্ত নিয়েছিল৷ কেন্দ্রীয় কমিটিতে সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়৷ তবে কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্তের অনেক আগেই ‘স্পিকার হাউসে’ নিয়ে ওর সঙ্গে কথা বলেছিলাম৷ আমার সামনেই তিনি প্রণব মুখোপাধ্যাকে ফোন করে বলেছিলেন, আমাকে অধ্যক্ষের পদ ছেড়ে দিতে হবে৷ আপনারা বিকল্প দেখুন৷ কিন্তু তারপরও সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় অধ্যক্ষের পদ ছাড়েন নি৷ পরিবর্তী পরিস্থিতিতে ওর সঙ্গে কংগ্রেসের কী কথা হয়েছে, তা আমি জানি না৷’’

ষাটের দশক থেকে রাজনীতি করছেন প্রাক্তন এই সাংসদ৷ ২০১৮ এসে শরীরই যেন তাঁর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী৷ তবে পার্টিই যে তাঁর বেঁচে থাকার রসদ, তা এক বাক্যে মানেন বাসুদেব আচারিয়া।

Advertisement
----
-----