সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা : এই বাড়ির ঝুলন যাত্রার পরিচিতি লক্ষ্মী-নারায়ণের লীলা খেলায়। ঝুলন যাত্রায় কৃষ্ণের জীবনের বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে সাজানো হয় পুতুল। আর কৃষ্ণ যেমন একাধারে অর্জুনের রক্ষাকর্তা তেমনই প্রেমের প্রতীক। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাধা কৃষ্ণের প্রেমই তুলে ধরা হয়। কিন্তু নীলমণি দে বাড়ির ঝুলন যাত্রা লোকমুখে পরিচিত ‘গলা কাটা ঝুলন’ নামে।

১২১ বছর আগে ঝুলন যাত্রার শুরু করেছিলেন নীলমণি দে। সেই যাত্রা থমকে গিয়েছে প্রায় বছর পঁয়ত্রিশ আগেই। শুধু পুরনো ইতিহাসে নামটুকু রয়ে গিয়েছে। ট্রাস্টিদের রক্ষণাবেক্ষণে এখনও তাক লাগিয়ে দেয় ঠাকুরদালানের কারুকার্য। আক্ষেপ শুধু একটাই। সময়ের অভাব। বড়ই অভাব সময়ের। সেটাই শেষ করেছে পুরনো ঐতিহ্যকে। পিছন ফিরে তাকালে আক্ষেপ ছাড়া আর কিছুই মেলে না বর্তমান ট্রাস্টি মহেশ্বর দে’র।

Advertisement

হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে খুঁজতে জানতে চাওয়া ‘গলা কাটা ঝুলন’-এর ইতিবৃত্ত। মহেশ্বরবাবু বলেন, “বউবাজার অঞ্চলে অনেকগুলো ঝুলন হত। ওই বাড়িগুলির পরিচিতি হয়ে গিয়েছিল ঝুলন যাত্রার নামে। যেমন একটি পরিবারে ঝুলনে হাট্টিমা টিম টিম কবিতার বিষয়টা দেখানো হত। বাড়ির নামও হাঁট্টিমা টিম টিম হয়ে গিয়েছে। আমাদের বাড়ির নামটাও সেইভাবে লোকমুখে ‘গলা কাটা ঝুলন’ হয়ে গিয়েছে।” কিন্তু এই গলা কাটা ঝুলনে ঠিক কি দেখানো হয়?

সেবায়েত বললেন, “দাতা কর্ণের পরীক্ষা নিয়েছিলেন কৃষ্ণ। তাঁর দানশীলতা পরীক্ষা করতে বাহ্মণের ছদ্মবেশে আসেন। তারপর খাদ্য হিসাবে চেয়ে বসেন কর্ণের ছেলের মাথা। কর্ণ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।” ছেলের মাথা কেটে ব্রাহ্মণরূপী কৃষ্ণের হাতে তুলে দেন ছেলের মাথা। কৃষ্ণ খুশি হয়ে আসল রূপ ফিরে এসে কর্ণের ছেলের জীবন ফিরিয়ে দেন। কর্ণ যে ছেলের মাথা কেটে দিয়েছিলেন এবং মাথা কাটা দেহ থেকে রক্ত স্রোত ঝড়ে পড়ছে এই দৃশ্যটাই ফুটে উঠত নীলমণি দে’র ঝুলন যাত্রায়।

রক্তের এই ‘খেলা’ দেখতে একসময় ঠাকুরদালানে তিল ধারনের জায়গা থাকত না। মহেশ্বর দে বলেন, “পুরো বিষয়টা যন্ত্রের মাধ্যমে দেখানো হত। অর্থাৎ পৌরাণিক চরিত্রের আদলে তৈরি লোহার পুতুলগুলি নড়াচড়া করত। পাশাপাশি একইরকমভাবে অহল্যা উদ্ধার, কমলা কামিনীর যাত্রাও দেখানো হত।” সে সব দিন গিয়েছে। রাখা যায়নি পুতুল। দিয়ে দিতে হয়েছে খিদিরপুরের এক ঝুলন উৎসব পালকদের।

মহেশ্বর দে বলেন, “পাঁচজন ট্রাস্টি আছি। তারাই এটাকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। নীলমণি দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কেরানি ছিলেন। কেরানিগিরি করে অর্থ জমিয়ে বউবাজার অঞ্চলে সখের বিরাট ঠাকুরদালান বানিয়েছিলেন। বারো মাসের তেরো পার্বণের প্রচলন করেন। সেই পুজো পার্বণ অবশ্য এখনও রয়েছে। কিন্তু সেই ভবিষ্যতও উজ্বল নয়। পরের প্রজন্ম এসব কিভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে সেবায়েতদের। আশা, লোকমুখে পরিচিতি পাওয়া গলাকাটা ঝুলণ যাত্রায় হয়তো বেঁচে থাকবে নীলমণি দে’র সাধের ঠাকুরবাড়ি।

----
--