‘ইংরেজ’ অসুরকে বধ করেছেন এই বাড়ির সিংহবাহিনী

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : রামলাল দে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়েছিলেন কি না জানা নেই। জানা নেই তৎকালীন ভারত শাসনকারী গোড়ার দল তাঁর ‘দুই চোখের বিষ’ ছিল কি না। তবু তাঁর শুরু করা একচালার প্রতিমায় দুর্গার পায়ের তলায় শায়িত থাকে হ্যাট, কোট পরা অসুর।

আরও পড়ুন- পুজোর ভিড়ে ক্লান্ত হয়ে পেতে পারেন ভূত রাজার বর

ভবানীপুরের এক ছোট্ট গলির ভিতরে হলুদ সবুজ রঙের বাড়ি দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। প্রবেশদ্বার দিয়ে ভিতরে গেলেই ঠাকুর দালান। দুধ সাদা রঙ দিয়ে তখন ঠাকুরদালানে রঙের পোঁচ দেওয়া চলছে। পূজা প্রস্তুতি তুঙ্গে। সামনেই ১৫০ বছরে আগে তৈরি করা মাটির ঠাকুর দালান। ওই দালানেই পূজিত হন ইংরেজরূপী অসুর দমনকারিণী দশভূজা।

- Advertisement -

কলকাতায় তুলোর ব্যবসা করতেন রামলাল দে। সেই রোজগার থেকেই ১৮৭০ সালে দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরে দুর্গার আরাধনা শুরু করেন রামলাল দে। কিন্ত কেন অসুর হ্যাট কোট পরে রয়েছেন তা বলতে পারলেন না পরিবারের সদস্যরা।

আরও পড়ুন- ‘অনুপ্রবেশকারী’ রাজনীতিকে ধাক্কা দিয়ে দুর্গা বন্দনায় বাংলাদেশি মুসলিম শিল্পীর গান

পরিবারের সদস্য সুমন্ত দে বলেন, “অসুরের কেন এমন রূপ দিয়েছিলেন আমাদের জানা নেই। কিন্তু অনেকেই বলেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই হয়তো এমন রূপ দিয়েছিলেন রামলাল দে।” তারপর থেকে সেই একইরূপ থেকে গিয়েছে। সবুজ রঙের অসুর মায়ের পায়ের তলায় রয়েছেন ইংরেজদের কোট প্যান্ট পরে।

দে পরিবারের ঠাকুরদালান তিন খিলানের দু’দালান বিশিষ্ট। বাইরের দালানের সম্মুখভাগে ফুল-লতা-পাতার অলঙ্করণ রয়েছে। মহিষাসুরমর্দিনী প্রতিমার সিংহ ঘোড়ামুখী নয়। দুর্গা সিংহবাহিনীই। পুজো হয় বিশুদ্ধসিদ্ধান্ত মতে। মহাষষ্ঠীর দিন থেকেই ঢাকের বাদ্যিতে বোধন হয় দেবীর। তারপর সপ্তমীতে বাবুঘাটে নিয়ে যাওয়া হয় কলাবৌ-স্নান করতে। আগে আদিগঙ্গায় কলাবৌ স্নান পর্ব হত। কিন্তু আদিগঙ্গা মজে গিয়েছে। তাই বাবুঘাটই ভরসা।

অষ্টমীর দিন কুমারীপুজো হয়। ওই দিন পরিবারের সকলে একসঙ্গে বসে পঙতিভোজন করেন। পশুবলি হয় না, পরিবর্তে চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয়।। অব্রাহ্মণ পরিবার, তাই অন্নভোগের প্রচল নেই। চাল, ডাল, বিভিন্ন ফল ও মিষ্টান্ন দেওয়া হয় নৈবেদ্য হিসেবে। এখনও নৈবেদ্যর সমস্ত মিষ্টান্ন বাড়িতে তৈরি করা হয়। সেই তালিকায় চন্দ্রপুলি, নারকোল ছাপা, লেডিকেনির মতো মিষ্টি রয়েছে। সঙ্গে লুচি তো রয়েইছে। হতে পারে হ্যাট কোট পড়া অসুর। কিন্তু ঠাকুর বিসর্জনে নিয়ে যাওয়া কাঁধে করেই।

দেড়শো বছর আগে রামলালবাবু তুলোর ব্যবসা শুরু করেছিলেন। সেই ব্যবসা পরবর্তী প্রজন্মের হাত ধরে এখনও বহমান। ব্যবসার ভাটা পড়েনি। কলকাতার অনেক বনেদী বাড়ির পুজো যখন খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে তখন ভবানীপুরের দে বাড়ির পুজো এগিয়ে চলেছে স্বচ্ছল ভাবে ।

Advertisement
-----