পুজো তো শেষ! ভিড় সামলে মেয়েকে দেওয়া কথা আর রাখা হল কই

স্টাফ রিপোর্টার, কলকাতা: পুজোর সময় নেহাত চরম পারিবারিক বিপর্যয় না হলে ছুটির কোনও প্রশ্নই নেই। ছেলেমেয়ের জন্মদিন হলেও কিছুটা সময় তাদের সঙ্গে কাটানোর বিলাসিতা নেই। বিয়ের তারিখ হলে স্ত্রী বা স্বামীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময়টুকুও নেই। মা-বাবা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও অবসর নেই দেখে আসার, খোঁজখবর শুধু এক ফাঁকে ফোনেই। বিজয়ার প্রণামের সময়ও অমিল বিসর্জনের ডিউটির চাপে। কাদের কথা বলছি হয়ত বুঝতে পেরেছেন৷ যাদের জন্য উৎসব মুখর মানুষ শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে ঠাকুর দেখতে পেরেছেন৷ গাড়ি নিয়ে পুজোর সময় ঘুরতে পেরেছেন৷ তাদের কথা বলছি৷ এরা হল কলকাতা পুলিশ৷

পুজো শেষে গঙ্গার ঘাটে ঘাটে চলছে প্রতিমা বিসর্জন৷ সেখানেও মোতায়েন রয়েছে প্রচুর পুলিশ বাহিনি৷ যারা পুজোর দিনগুলোতেও নিজ নিজ কর্তব্য পালন করেছেন৷ আজও কর্তব্য পালন করে চলেছেন৷ এমনই একজন পুলিশ কর্মীর কথা উঠে এল পুলিশেরই ফেসবুক পেজে৷

যাঁদের ডিউটি শুরু বিকেল তিনটেয়, অপেক্ষা করছেন “স্ট্যান্ড ডাউন”-এর। অর্থাৎ পুলিশি ভাষায় যাকে বলে ডিউটি শেষের ঘোষণা। লালবাজার কন্ট্রোল জানিয়ে দিল, “stand down for the entire force”। ওয়ারলেসবাহী বার্তা আগুনের চেয়েও দ্রুত পৌঁছে গেল কর্তব্যরত পুলিশ কর্মীদের কাছে। হাঁফ ছাড়লেন উর্দিধারীরা।মণ্ডপ থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ফোর্সের বাস। ডিউটি শেষে শরীরটাকে টেনে নিয়ে চলা সেদিকে।

তখননি একজন অপর জনকে প্রশ্ন করছেন তোর কাল কোথায় ডিউটি ? উত্তর এল আমার বাবুঘাটে,দুপুর দুটো থেকে।উত্তরটা দিয়েই মনে পড়ে যায় মাঝবয়সী কনস্টেবলের, ভুল হয়ে গিয়েছে একটা। বারো বছরের মেয়ে পুজোর আগে বায়না ধরেছিল ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’ দেখার। তখনকার মতো সামলাতে কথা দিয়ে ফেলেছিলেন, দশমীর পরের দিন শিওর নিয়ে যাব। কত আশা করে থাকবে বেচারি। অথচ আরও দিন তিনেকের আগে কোনও চান্সই নেই। কারণ বিসর্জনের ডিউটি আছে৷

মন খারাপ হয়ে যায় খুব। এদিক-সেদিক থেকে সহকর্মীদের “শুভ বিজয়া” তেতো লাগতে শুরু করে, সৌজন্য সারেন “হুঁ হাঁ”-তে। বাসের কাছাকাছি এসে মুখোমুখি পড়ে যান মেয়েটির। কত বয়স হবে? ওই এগারো-বারোই। সঙ্গে মা-বাবা, সারা রাত ঠাকুর দেখার তৃপ্তিতে মুখ আলো-ঝলমল। ভীষণ অপ্রস্তুত করে হঠাৎই হাত বাড়িয়ে দিয়েছে অবসন্ন কনস্টেবলের দিকে, “কনগ্র্যাটস আঙ্কল, শুভ বিজয়া!”

এমন পরিস্থিতিতে কর্মজীবনে পড়েননি কখনও। নিন্দেমন্দ শুনেই অভ্যস্ত। এক হাতে ব্যাগ, অন্য হাতে লাঠি। নিজেকে সামলে নিয়ে হাতবদল করে নেন লাঠি। হাতে হাত মিলে যায় দুজনের। আর ঠিক ওই মুহূর্তেই কোন ম্যাজিকে কে জানে, সাময়িক দূর হয়ে যায় সাতদিনের শারীরিক-মানসিক ক্লান্তি।

বাসে ওঠার পর মনে হয়, আচ্ছা, ওই বাচ্চা মেয়েটা কি ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’ দেখেছে? জিজ্ঞেস করলে হত। যাক গে, আর তো মোটে তিনটে দিন। তারপরেই মেয়েকে নিয়ে যাব ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’দেখাতে। আজ-কাল-পরশু আইসক্রিম দিয়ে রাগ ভাঙাতে হবে। এই তো পুলিশের জীবন যা সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা৷ তবু তারা বলেন আবার এসো মা৷

----
-----