রাজ্য সরকারের নজরে ‘বাঘ বিধবা’

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা : বাঘ বিধবা, না এর সঙ্গে বাঘের বিধবা হওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই। বাঘিনী সঙ্গীহারা হতেই পারে। কিন্তু ব্যঘ্র সমাজে তখন তাঁকে ‘বাঘ বিধবা’ হিসাবে গণনা করার কোনও রীতি নেই। এই বাঘ বিধবা হলেন সুন্দরবনের সেই সব মহিলারা যাদের স্বামীরা বাঘের পেটে গিয়েছেন। এঁদের সাহায্য করতে বিশেষ উদ্যোগ নিতে চলেছে রাজ্য সরকার।

সুবন্য সরকার, সরস্বতী মাঝি, শিলা দেবী। এঁদের প্রত্যেকের স্বামীই আজ থেকে প্রায় বছর কুড়ি বা ত্রিশেক আগে মারা গিয়েছেন বাঘের কবলে পড়ে। মহিলারা জানাচ্ছেন স্বামীরা কেউ মাছ চাষ করতেন, কেউবা কাঠ কাটতেন, কেউ আবার মধু চাষ করতেন। এই কাজ করতে গিয়েই তাঁদের বাঘে টেনে নিয়ে গিয়েছে। দুর্ঘটনা ছাড়া এটা আর কিছুই নয়। কিন্তু সমাজের অন্ধকার দিক সব সময়েই এঁদেরকে সরিয়ে রেখেছে।

ওইসব অঞ্চলে প্রচলিত আছে এক অন্য কাহিনী। বাঘ তাঁদের কাছে ঈশ্বর। নির্ঘাত বউয়ের গুনেই ঘাট রয়েছে। সেই কারণেই তাঁকে সাজা দিয়েছেন ‘ভগবান বাঘ’। অন্ধ বিশ্বাসে জর্জরিত শুরু করে অত্যাচার। অর্থনৈতিক ভাবেও বিপর্যস্ত সুন্দরবনের বিধবা মহিলারা দিনের পর দিন এই কষ্ট নিয়েই বাঁচছেন।

- Advertisement -

মাস বছর পেরোয়, এঁদের কোনও হাল হয় না। বেহাল দশার হাল ফেরানোর জন্য সচেষ্ট হচ্ছে রাজ্য সরকার। ‘রাজা রামমোহন রায় অ্যান্ড পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ফাউন্ডেশন’-এর সঙ্গে একজোট হয়ে এঁদের সাহায্য করার পরিকল্পনা করছে সরকার।

‘রাজা রামমোহন রায় অ্যান্ড পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে একটি অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল শহরে। সেখানেই উপস্থিত ছিলেন সুন্দরবনের ৮ বাঘ বিধবা। এঁদের সাহায্যের উদ্যোগ প্রসঙ্গে পঞ্চায়েত মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, “আমাদের এমনিতেই দুটি পাইলট প্রোজেক্ট রয়েছে। একটির NRLM , অপরটি NRGEA। NRLM-এ গ্রামের মেয়েদের একটা টিম রয়েছে প্রায় ৫০ জনের।

এরা হাতে সুতোর কাজ থেকে শুরু করে চিরুনি, ব্যান্ডেজ, বেতের কাজ করেন। এঁদের তৈরি জিনিস আমরা নিজেরা দায়িত্ব নিয়ে বাজারে বিক্রি করি। এরপর ওই টাকা ব্যাঙ্কের মাধ্যমে ওদের কাছে পৌঁছে যায়।” কিন্তু ওই বাঘ বিধবারা কিভাবে উপকৃত হবেন? “ওদের নিজের একটু এগিয়ে আসতে হবে। গ্রাম প্রধানের মাধ্যমে জব কার্ড করালেই কাজ মিলবে। সেখান থেকে প্রাপ্ত টাকা কেউ না পেলে আমাদের দায়িত্ব তা ১৫ দিনের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া।” তবে তিনি এও জানিয়েছেন, “আলাদা করে কোনওদিন ভাবা হয়ে ওঠেনি বা সরকারের পক্ষে এরকম ভাবে ভাবা সম্ভব নয়।”

এই প্রসঙ্গে ‘রাজা রামমোহন রায় অ্যান্ড পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ফাউন্ডেশন’-কে সাধুবাদ জানিয়েছেন। সোজাসুজি না হলেও অন্য কোনও ভাবে সরকার এই সংস্থার সঙ্গে কাজ করতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। সংস্থার প্রধান বিন্ধ্যেশ্বর পাঠককে তাঁর দফতরে দেখা করতে বলেছেন তিনি।

এই সংস্থা মূলত বিধবা মহিলাদের নিয়ে সারা দেশ জুড়ে কাজ করে। বৃন্দাবন, উত্তরাখণ্ডের সঙ্গে তালিকায় প্রবেশ করবে সুন্দরবনও। প্রায় ৫০ বছর ধরে এই কাজ করে চলেছেন তাঁরা। সমাজ থেকে দূরে সরে যাওয়া বিধবাদের আলোর পথে ফিরিয়েছে তাঁরা। তাঁদের স্বাবলম্বী করেই এই কাজ করেছে সংস্থা। তাঁদের চোখ পড়েছে আবার বাঘ বিধবাদের উপরেও। তাঁদের নিয়ে কাজ করতেই রাজ্য সরকারের কাছে সাহায্য চেয়েছে সংস্থা।

বাঘে মানুষে সম্পর্ক খাদ্য খাদকেরই থাকবে। কিন্তু সাহায্য পেলে কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে নতুন জীবন পেতেই পারে এঁরা। সেই দিনের জন্যই অপেক্ষায় বাঘ বিধবারা৷

Advertisement ---
---
-----