মুকুল-মদনের উপেক্ষায় শহিদ মঞ্চে ‘ভাইপো’র অভিষেক

বিজয় রায়, কলকাতা: জল্পনা কল্পনা অনেক দিন ধরেই চলছিল৷ ২১ শে জুলাই শহিদ সমাবেশের মঞ্চেই তার অবসান হল৷ একসময়ে দলের কাণ্ডারী মুকুল রায়কে যে আর দরকার নেই তা পরিষ্কার বুঝিয়ে দিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের যুবরাজ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়৷ একসময়কার রাজনৈতিক ‘শিক্ষাগুরু’ মুকুল রায়ের নামটুকুও মুখে তুলেন না অভিষেক৷ একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের সঙ্গী মুকুলের নাম না নিয়ে তৃণমূল নেত্রীও বুঝিয়ে দিলেন ‘ভাইপো’র এই সিদ্ধান্তে সায় আছে ‘পিসি’রও৷

ধর্মতলায় শহিদ দিবসের মঞ্চে উঠতে দেওয়া হল না মদন মিত্রকে

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর দলের ব্যাটন কার হাতে থাকবে তা নিয়ে তৃণমূলে জল্পনা নতুন কিছু নয়৷ সংগঠনকে আরও মজবুত করতে ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে অনেকদিন আগেই গুরুদায়িত্ব দিয়েছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ নেত্রীর এহেন সিদ্ধান্তে দল যে ইতিমধ্যে সমান্তরাল দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে তা কানাঘুষো শোনা যাচ্ছিল অনেকদিন ধরেই৷ এবার শহিদ সমাবেশের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তা আরও একবার পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়৷ এবারের ২১ শে জুলাইয়ের সমাবেশে সুব্রত বক্সি, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, সুব্রত মুখোপাধ্যায় এমনকী সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ও একে একে বক্তব্য রাখলেও মাইক হাতেই পেলেন না মুকুল রায়৷ এদিকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সংগঠনের প্রথম সারির নেতাদের ধন্যবাদ জানান তৃণমূলের যুবরাজ অভিষেক৷ তবে সেই তালিকা থেকেও বাদ পড়লেন মুকুল রায়৷

- Advertisement -

করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে : একুশের মঞ্চে মমতাই ‘মহাত্মা’

তবে শুধু অভিষেক নয়৷ এক সময়ের সর্বক্ষণের ছায়াসঙ্গী মুকুল রায়কে উপেক্ষো করলেন খোদ দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও৷ জেলাস্তরের কোনও অনুষ্ঠান বা ২১ শে জুলাইয়ের সমাবেশ, সব ক্ষেত্রেই একটা সময় মুকুল রায়কে চোখে হারাতেন তৃণমূল নেত্রী৷ তবে এদিন ধরা পড়ল একেবারেই ভিন্ন ছবি৷ মুকুলকে নিষ্ক্রিয় করা নিয়ে অনেকদিন ধরেই দলে একটা গুঞ্জন চলছিল৷ বিগত প্রায় বছর খানেক ধরেই দলের কোনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যায়নি মুকুল রায়কে৷ এমনকী কয়েকদিন আগে ত্রিপুরার সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে তাঁর জায়গায় সব্যসাচী দত্তকে দায়িত্ব দেন তৃণমূল নেত্রী৷ তৃণমূল ভবনে মুকুল জামানা যে শেষ তখনই তার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল৷ এদিন মমতা-অভিষেকের ভূমিকায় মুকুলের কফিনে শেষ পেরেকটি পোঁতা হল বলেই মনে করা হচ্ছে৷

বিজেপির বিরুদ্ধেই আসল লড়াই-সভামঞ্চ থেকে বার্তা মমতার

দল যখন ক্ষমতায় আসেনি তখন থেকে শুরু করে সংগঠনের যেকোনও সঙ্কটমোচনে পুরাভাগে ছিলেন দক্ষিণ কলকাতার জনপ্রিয় নেতা মদন মিত্রও৷ এদিন মুকুল রায়ের পাশাপাশি তাঁকেও কার্যত উপেক্ষা করল দল৷ শহিদ মঞ্চে টলি তারকাদের ভিড় থাকলেও ঠাঁই হল না মদন মিত্রের৷ অনেকেই বলছেন যুবরাজ অভিষেকের নির্দেশেই মঞ্চে উঠতে বাধা দেওয়া হয় মদন মিত্রকে৷ আর এই ঘটনা নিয়েই শুরু হয়েছে দলে জোর চর্চা৷

শহিদ দিবসে মানবাধিকার লঙ্ঘন কলকাতা পুলিশের

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৃণমূলের এক ছাত্র নেতার কথায়, গতকাল রাতে সভার প্রস্তুতি দেখতে এসেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়৷ মিনিট তিরিশ থাকার পর সেখান থেকে চলে যান তিনি৷ তবে অভিষেকের যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই হাজির হন মদন মিত্র৷ দলে মদনের জনপ্রিয়তা যে এতটুকুও চিঁড় ধরেনি তা ওই ছাত্রনেতার কথাতেই স্পষ্ট৷ তিনি বলেন, ‘গতকাল মদন মিত্রকে দেখা মাত্রই উচ্ছাসে ফেটে পড়েন কর্মীরা৷ মুহূর্তের মধ্যে ভিড় জমতে শুরু করে৷ পরে কর্মী-সমর্থকেরা মানববন্ধন তৈরি করে গার্ড করে রাখেন তৃণমূলের ‘ছোড়দা’কে৷

ফলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যতই অভিষেককে সামনের সারিতে আনার চেষ্টা করুক না কেন দলে মুকুল রায় ও মদন মিত্রের জনপ্রিয়তা এতটুকুও ভাটা পড়েনি৷ বিশেষ করে গতকাল রাতে মদনকে ঘিরে কর্মী সমর্থকদের উৎসাহ সেটাই প্রমাণ করে৷ একই সঙ্গে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ওই অংশের মতে জেলাস্তরে এখনও মুকুল রায়ের যে জনপ্রিয়তা আছে তাতে অনেকটাই পিছিয়ে অভিষেক৷ ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবর্তমানে দলে নিজের দাপট আদৌ থাকবে কিনা বা কতটা থাকবে, সেই আশঙ্কা থেকেই কি মুকুল-মদনকে উপেক্ষা? মমতার বাকি পুরনো সঙ্গীদেরও কি একইভাবে একে একে সাইডলাইন করার চেষ্টা করবেন অভিষেক? উঠছে প্রশ্ন৷

আর হয়ত এই প্রশ্নের উপরই নির্ভর করবে রাজ্যে তৃণমূলের ভবিষ্যত৷ তবে, শহিদ দিবসের মঞ্চটা বরাবরই বার্তা দেবার মঞ্চ হিসাবেই দেখে তৃণমূল কংগ্রেস৷ দলের প্রকাশ্য বার্তা, পথ চলার দিকনির্দেশ, ২১ শে জুলাই ধর্মতলার মঞ্চ থেকেই দেওয়া হয়৷ নেতা থেকে কর্মী, দলের সবাই এটা জানেন, এটাই মানেন৷ আর সেই বার্তা দেবার মঞ্চ থেকেই যে বার্তা আজ সমস্ত নেতা কর্মীকে প্রকাশ্যে দেওয়া হল, তাতে মুকুল মদন সহ মমতার পুরনো সঙ্গীদের অনেকেই যে আদৌ স্বস্তিতে থাকবেন না তা বলাই যায়৷

Advertisement
---