বামেদের কায়দায় জমি অধিগ্রহণই না কাল হয় তৃণমূলের

সুমন বটব্যাল, কলকাতা: তবে কি সিঙ্গুর ‘রায়’ই ব্যুমেরাং হতে চলেছে ‘পরিবর্তনে’র সরকারের কাছে! প্রশ্নটা ভীষণভাবে উঠছে৷ সৌজন্যে, রাজ্যজুড়ে জমি বিরোধী আন্দোলন৷ বুধবারই, এই বছরের ১৪ মার্চ পূর্ণ হল নন্দীগ্রাম গণহত্যার ১১ বছর৷ স্বভাবতই রাজনৈতিক মহলে ভীষণভাবে এই প্রশ্নটা উঠতে শুরু করেছে৷

ওই মহলের মতে, ৩৪ বছরের চরম ঔদ্ধত্যে জোর করে গরিব চাষির জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে নিজেদের পতন অনিবার্য করে তুলেছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য-বিমান বসুরা৷ সাড়ে ছ’বছরের ‘পরিবর্তনে’র সরকারও সেই পথেই হাঁটছে৷ রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, তারই পরিণাম বীরভূমের বোলপুর, পূর্ব মেদিনীপুরের ভগবানপুর, সর্ব শেষ সংযোজন ভাঙড়৷

কোথাও ‘সংহতি মঞ্চ’, কোথাও বা ‘জমি জীবিকা ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষা কমিটি’র ব্যানারে সরকার বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছে৷ ইতিমধ্যে ভাঙড়ে শাসক বনাম জমিরক্ষা কমিটির সংঘর্ষে দুই জনের মৃত্যু হয়েছে৷ স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়-ই দ্বিতীয় সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম হয়ে উঠবে না তো?

- Advertisement -

এখানে উল্লেখ করা থাক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লাগাতার আন্দোলনের জেরে সিঙ্গুর থেকে ন্যানোর পাঠ চুকিয়ে রাজ্য ছাড়তে বাধ্য হয়েছে টাটা গোষ্ঠী৷ ২০১৬-র ৩১ অগস্ট সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণকে অবৈধ ঘোষণা করে অধিগৃহীত জমি, জমিদাতাদের ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয় শীর্ষ আদালত৷ পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেয়, এ ভাবে জোর করে জমি অধিগ্রহণ করা যাবে না৷ এর পরই ঘটা করে ২০১৬-র ১৪ অক্টোবর সিঙ্গুরের চাষিদের জমি ফিরিয়ে দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷

এর পরই সুপ্রিম কোর্টের রায়কে সম্বল করে কলকাতার উপকণ্ঠে রাজারহাটে নতুন টাউনশিপ, বর্ধমানের উল্লাস উপনগরী, শিলিগুড়ির কাওয়াখালি উপনগরী, পুরুলিয়া জেলার রঘুনাথপুর, আসানসোলের অন্ডালে অধিগৃহীত জমি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন জমিদাতারা৷

ওই তালিকায় রয়েছে বীরভূমের বোলপুরও৷ ভারী শিল্প স্থাপনের জন্য ২০০১-তে এখানে জমি অধিগ্রহণ করেছিল বাম সরকার৷ সম্প্রতি ওই জমিতে বিশ্ব বাংলা বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকার৷ কিন্তু চাষিরা অনড় থাকায় সেই উদ্যোগও বন্ধ হয়ে গিয়েছে৷

সরকার বিরোধী ক্ষোভ যে বাড়ছে তার সর্বশেষ সংযোজন নন্দীগ্রামের জেলা ভগবানপুরের মহম্মদপুর-এক৷ জোর করে চাষের জমিতে নোনাজল ঢুকিয়ে মাছ চাষ করার প্রতিবাদে জনরোষে মৃত্যু হয়েছে দাপুটে তৃণমূল কংগ্রেস নেতা তথা উপ প্রধান নান্টু প্রধানের৷ শুধু তাই নয়, নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুরের কায়দায় গ্রামবাসীদের হাতে লেখা পোস্টার, ‘ভেনামি (চিংড়ি) চাই না, ভাত চাই’য়ে ছেয়ে গিয়েছে গ্রাম!

রাজ্য ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরের এক আধিকারিকের পর্যবেক্ষণ, ‘‘সিঙ্গুর প্রশ্নে শীর্ষ আদালত যেভাবে জোর করে জমি অধিগ্রহণ করা যাবে না বলে রায় দিয়েছে, তাতে জোর করে জমি অধিগ্রহণ করা তো যাবেই না, উলটে করতে গেলে হিতে বিপরীত হবে৷’’ বিজেপি নেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায়ের কটাক্ষ, ‘‘এখন শিল্প শিল্প করে চেঁচালে হবে৷ জোর করে জমি না দেওয়ার পথ তো মুখ্যমন্ত্রীই দেখিয়েছেন৷’’

একই সঙ্গে তাঁর দাবি, ‘‘তৃণমূলের পায়ের তলার মাটি সরে গিয়েছে৷ মানুষ ওদের পাশে নেই৷ তাই গায়ের জোর ফলাচ্ছে৷’’ তৃণমূল কংগ্রেসের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের অবশ্য দাবি, ‘‘কোথাও জোর করে জমি নেওয়া হচ্ছে না৷ বিরোধীরা চক্রান্ত করে রাজ্যে অশান্তি পাকাতে চাইছে৷’’

Advertisement ---
-----