মমতার স্বাস্থ্য-বোর্ডে বড় মাপের কেলেঙ্কারির জেরেই টনক নড়ল রাজ্যের

বিশ্বজিৎ ঘোষ, কলকাতা: খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৎপরতায় চালু স্বাস্থ্য-বোর্ডে বড় মাপের নিয়োগ কেলেঙ্কারির জেরেই শেষ পর্যন্ত টনক নড়ল রাজ্য সরকারের৷ যার জেরে, প্রায় দুই বছর আগে বিধানসভায় পাশ হওয়া বিলকে আইনে পরিণত করতে এ বার গঠিত হল কমিটি৷

রাজ্য সরকারের মনোনীত চার সদস্যের ওই কমিটি এ বার পাশ হওয়া ওই বিলকে আইনে পরিণত করার জন্য রুলস তৈরি করবে৷ চলতি মাস অর্থাৎ, অগস্টের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ওই রুলস-এর খসড়া যাতে তৈরি করা হয়, তার জন্য গত পয়লা অগস্টের এক নির্দেশে ওই কমিটির সদস্যদের অনুরোধ জানানো হয়েছে৷ পাশ হওয়া ওই বিল আইনে পরিণত হলে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (এমটি) এবং চিকিৎসা পরিষেবা ক্ষেত্রে অন্যান্য টেকনিক্যাল পার্সন অর্থাৎ, এই সব স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য কাউন্সিল গঠিত হবে৷

আরও পড়ুন:  মমতার স্বাস্থ্য-বোর্ডেই কেলেঙ্কারি, রাজ্য জুড়ে নিয়োগ বহু ভুয়ো স্বাস্থ্যকর্মী

- Advertisement -

যার জেরে, ডাক্তার, নার্সদের মতো এই সব স্বাস্থ্যকর্মীকেও রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেওয়া হবে৷ এবং, এ ক্ষেত্রে নজির গড়বে পশ্চিমবঙ্গ৷ কারণ, দেশের মধ্যে প্রথম এ রাজ্যেই এই কাউন্সিল গঠিত হবে৷ ২০১৫-র ২৯ সেপ্টেম্বর রাজ্য বিধানসভায় পাশ হয়েছিল ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যালায়েড-মেডিক্যাল অ্যান্ড প্যারা-মেডিক্যাল কাউন্সিল অ্যাক্ট, ২০১৫৷ অথচ, পাশ হওয়া এই বিলকে আইনে পরিণত করার জন্য এত দিন পর্যন্ত রাজ্য সরকারের তরফে কোনও তৎপরতা দেখা যায়নি বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহলের বিভিন্ন অংশ৷

এ দিকে, স্বাস্থ্য-বোর্ডের মাধ্যমে এই প্রথম স্থায়ী পদে ওই সব স্বাস্থ্যকর্মীকে নিয়োগের ক্ষেত্রে বড় মাপের কেলেঙ্কারি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে৷ এই ধরনের পরিস্থিতিতে ওয়াকিবহাল মহলের ওই সব অংশে এখন এমনই বিভিন্ন প্রশ্ন উঠছে যে, বিল পাশ হওয়ার পরে যেভাবে তা আইনে পরিণত না করে এত দিন ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল, তার জন্য কি কোনও চক্র কাজ করেছিল? ওই চক্রের প্রভাবেই কি স্বাস্থ্য-বোর্ডের মাধ্যমে স্থায়ী পদে ভুয়ো এমটি-দের নিয়োগ করা হয়েছে?

একই সঙ্গে ওই সব অংশ এমনও মনে করছে যে, বিল পাশের পরে সময় নষ্ট না করে কাউন্সিল গঠিত হলে স্থায়ী পদে এ ভাবে ভুয়ো এমটিদের নিয়োগের বিষয়টি রুখে দেওয়া যেত৷ কারণ, কাউন্সিল গঠিত হলে এমটিদের রেজিস্ট্রেশন নম্বর থাকত৷ এ ক্ষেত্রে, রেজিস্ট্রেশন নম্বর নেই এমন কোনও এমটিকে নিয়োগ করতে পারত না স্বাস্থ্য-বোর্ড৷ অথচ, তেমনটা না হওয়ায়, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্তরের সরকারি হাসপাতালে এখনও রোগনির্ণয়ের কাজ করে চলেছেন বহু ভুয়ো এমটি তথা স্বাস্থ্যকর্মী৷ কারণ, স্থায়ী পদে ভুয়ো এই স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে যে বড় মাপের কেলেঙ্কারি হয়েছে, সেই বিষয়ে খোঁজখবর পাওয়ার পরে তদন্ত শুরু করে স্বাস্থ্য দফতর৷ ওই তদন্তের জেরে এখনও পর্যন্ত পাঁচ জন ভুয়ো এমটিকে টার্মিনেট করা হয়েছে৷

কিন্তু, এক সূত্রের কথায়, ‘‘শুধুমাত্র এমটি (ল্যাবরেটরি)-দের স্থায়ী পদেই প্রায় ১০০ জন ভুয়ো এমটিকে নিয়োগ করা হয়েছে৷ আর, ল্যাবরেটরি সহ এমটিদের অন্যান্য ক্ষেত্র মিলিয়ে এই সংখ্যাটা প্রায় ১৫০ জন৷’’ স্থায়ী পদে এই সব ভুয়ো স্বাস্থ্যকর্মীকে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য-বোর্ডের বড় মাপের কেলেঙ্কারির বিষয়টি গত ২১ জুন ফাঁস করেছিল www.kolkata24x7.com৷ সেই সময় রাজ্যের স্বাস্থ্য অধিকর্তা বিশ্বরঞ্জন শতপথী www.kolkata24x7.com-কে বলেছিলেন, ‘‘ভুয়ো কি না বলতে পারব না, তবে নিয়োগের নিয়মের সঙ্গে মিল না থাকার জন্য দুই জনকে টার্মিনেট করা হয়েছে৷ অন্য তিনজনের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে৷’’ কিন্তু, ১২ জন এমটি (ল্যাবরেটরি)-র একটি তালিকা প্রকাশ্যে এসেছে… স্বাস্থ্য অধিকর্তা তখন বলেছিলেন, ‘‘সংখ্যাটা আরও বেশি হতে পারে৷ তদন্ত চলছে৷’’

কী বলছেন এখন স্বাস্থ্য অধিকর্তা? এই বিষয়ে জানার জন্য স্বাস্থ্য অধিকর্তাকে ফোন কল করা হয়৷ তবে, তিনি ফোন কল না ধরায় তাঁর বক্তব্য মেলেনি৷ এ দিকে, তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থিত ওয়েস্ট বেঙ্গল প্রোগ্রেসিভ মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের রাজ্য সম্পাদক, সমিত মণ্ডলের কথায়, ‘‘বিল পাশের পরে দ্রুত তা আইনে পরিণত হলে এই ভুয়ো এমটিদের নিয়োগের বিষয়টি আটকে দেওয়া যেত৷ স্বাস্থ্য দফতর তদন্ত করছে, এটা ভালো দিক৷ কিন্তু, স্বাস্থ্য-বোর্ডে যাঁরা নিয়োগের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধেই আগে তদন্ত হওয়া উচিত৷’’ একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারি কর্মচারী ফেডারেশনের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার কোর কমিটির এই সদস্য বলেন, ‘‘এই কাউন্সিল গঠনের জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে আমরা ধন্যবাদ জানাচ্ছি৷ তবে, খুব তাড়াতাড়ি যাতে আইন চালু হয়, তার জন্য আমাদের তরফে মুখ্যমন্ত্রী এবং আমাদের সংগঠনের উঁচু স্তরে দৃষ্টি আকর্ষণ করানো হয়েছে৷’’

গত ফেব্রুয়ারি এবং এপ্রিল মাসে ওয়েস্ট বেঙ্গল হেলথ রিক্রুটমেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে স্থায়ী পদে যে সব স্বাস্থ্যকর্মীকে নিয়োগ করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যেই এই সব ভুয়ো স্বাস্থ্যকর্মীরাও রয়েছেন৷ এ দিকে, খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৎপরতায় গঠিত এই স্বাস্থ্য-বোর্ডের মাধ্যমে প্রথমবার এই স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়োগের ক্ষেত্রেই যেভাবে বড় মাপের কেলেঙ্কারি হয়েছে, সেই বিষয়ে খোঁজখবর পাওয়ার পরে স্বাস্থ্য দফতর তদন্ত শুরু করলেও, অভিযোগও উঠেছে৷ এক সূত্রের কথায়, ‘‘হেলথ রিক্রুটমেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর্মীদের এই নিয়োগের ক্ষেত্রে বড় মাপের কেলেঙ্কারি হয়েছে৷ তাই, বিষয়টি কীভাবে প্রকাশ্যে আসতে না দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়, এখন তারই চেষ্টা করে চলেছেন স্বাস্থ্য দফতরের বিভিন্ন আধিকারিক৷’’

Advertisement
---