ইউরোপে ঢুকতে একদিন দ্য গলেরই পায়ে পড়েছিল ব্রিটেন

নিখিলেশ রায়চৌধুরী
নিখিলেশ রায়চৌধুরী

ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ইংল্যান্ডে গণভোট হয়েছে৷ সেই রায় বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষেই গিয়েছে৷ যদিও বেরিয়ে যাওয়া মানে যে ব্যাপারটা আজ বাদে কালই ঘটবে, তা নয়৷ ঠিকমতো প্রক্রিয়া চললে অন্তত বছর দুই লেগে যাবে৷ শুধু তাই নয়৷ ব্রিটেনের বাদবাকি অংশগুলি, অর্থাৎ স্কটল্যান্ড, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড কিংবা ওয়েলশের মতো একটি রাজ্যও যদি গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে রায় দেয়, তাহলে তার ভিত্তিতেই ব্রিটিশ পার্লামেন্ট চাইলে ইংল্যান্ডের রায়ের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যেতে পারে৷ তাছাড়া, ব্রিটিশ সংবিধানের ৫০ নং ধারা কার্যকর করলে তবেই এই ধরনের কোনও গণভোটের রায়ে শিলমোহর পড়ে৷ তার চাইতেও উল্লেখযোগ্য, যাঁরা ইউরোপ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলেছিলেন এর মধ্যেই তাঁদের একটি অংশ নাকি অনুতপ্ত৷ তাঁরা বলছেন, আবার মতামত দেওয়ার কোনও সুযোগ পেলে তাঁরা ‘না’ বলতেন৷ আর সেই সংখ্যাটা ক্রমেই বাড়ছে৷

ইউরোপ ছাড়তে চেয়ে ইংল্যান্ডে যে গণভোট নেওয়া হয়েছে, তাতে তেমন ভোটও পড়েনি৷ ঢালাও ভোট বলতে যা বোঝায় তা একেবারেই নয়৷ আর, ভাঙনের পক্ষে ‘হ্যাঁ’টাও তেমন জোরালো নয়৷ যে কারণে সেখানে দ্বিতীয়বার গণভোটের জন্য একটা আওয়াজ উঠেছে৷ সেই আওয়াজে সায় দিয়েছে অন্তত ২৯ লক্ষ ব্রিটেনবাসী৷

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসতে চাননি৷ কিন্তু তাঁকে তাঁর দল কনজারভেটিভ পার্টিরই একটি বড় অংশের প্রবল চাপের মুখে পড়তে হয়৷ ইতিহাসের পরিহাস হল এই যে, আজ যে ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ নিয়ে ভারতের মতো দেশেও অনেকের মাথায় বাজ ভেঙে পড়েছে, সেই ব্রিটেনই কিন্তু একদিন ইউরোপের কমন মার্কেটে ঠাঁই পাওয়ার জন্য কাকুতি-মিনতি করেছিল৷ আর সেদিন তাদের ইউরোপের বাজারে ঢোকা যিনি আটকে দিয়েছিলেন, তাঁর নাম দ্য গল৷ ১৯৬০-এর দশকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গলের লক্ষ্য ছিল একটাই৷

১৯৬০-এর দশকের ফরাসি প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গল
১৯৬০-এর দশকের ফরাসি প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গল

ফ্রান্সের নেতৃত্বে তিনি একটি স্বেচ্ছাধীন, আগমার্কা ইউরোপীয় ইউরোপ গড়ে তুলবেন৷ দ্য গল বলতেন, তাঁর স্বপ্নের সেই ইউরোপের সীমানা হবে আটলান্টিক থেকে উরাল৷ দ্য গলের মতে, এভাবে যদি ইউরোপকে সাজানো যায়, তাহলে তাঁদের আর আমেরিকার মুখাপেক্ষী হতে হবে না৷ কিন্তু তাঁর সেই স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করতে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ব্রিটেন৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবীতে আমেরিকার হুকুম ছাড়া ব্রিটেনের এক পা নড়ারও উপায় ছিল না৷ অথচ, নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মতে যারা ‘বানিয়ার জাত’, তাদের তখন লোভনীয় ইউরোপীয় কমন মার্কেটে প্রবেশের খুবই দরকার৷ তদানীন্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ম্যাকমিলান ধরলেন দ্য গলকে৷ প্যারিসের সেই বৈঠকে দ্য গল বললেন, আমরা তো চাইছিই আপনারা আসুন৷ কিন্তু আপনাদের ইউরোপের বাজারের শর্তে চলতে হবে এবং আমেরিকার সঙ্গে আলাদা করে কোনও সামরিক পরমাণু চুক্তি করতে পারবে না৷ দীর্ঘদেহী দ্য গলের যুক্তি পরিষ্কার, তাঁর কথায় অস্পষ্টতার লেশমাত্রও নেই৷ কিন্তু ব্রিটিশ ম্যাকমিলান ঢোক গিলছেন৷ সোজা কথার সোজা উত্তর তাঁর কাছ থেকে মিলছে না৷ এদিকে ইউরোপের বাজার তখন ব্রিটিশ বাণিজ্য মহলের কাছে না হলেই নয়৷ শেষ পর্যন্ত দ্য গলের ঋজুতার কাছে হেরে গেলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী৷ ম্যাকমিলান সত্যি সত্যিই কেঁদে ফেললেন৷আর তা দেখে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফরাসি প্রতিরোধের রক অব জিব্রাল্টার গেয়ে উঠলেন— ডোন্ট উইপ, মাইলর্ড!

দ্য গল জানতেন, হ্যারল্ড ম্যাকমিলান কথা রাখতে পারবেন না৷ কারণ, প্যারিস থেকেই তাঁর ডাক পড়েছিল বাহামায়৷ ডেকে পাঠিয়েছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি৷ এদিকে দ্য গল যেমন, ওদিকে কেনেডিও তেমন খুব ভালো করেই জানতেন একসময়ের ব্রিটিশ সিংহ এখন তাঁদেরই পায়ের ভৃত্য৷ ব্রিটেনকে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র  দেওয়ার লোভ দেখিয়ে কেনেডি বশ করেছিলেন৷ তার পরেও ইউরোপীয় কমন মার্কেটে ঢোকার জন্য বার বার চেষ্টা করেছে ব্রিটেন৷ কিন্তু যত দিন ফ্রান্সের ক্ষমতায় দ্য গল ছিলেন, তত দিন তাদের পক্ষে সেখানে ঠাঁই পাওয়া সম্ভব হয়নি৷ দ্য গলের কথা ছিল একটাই— ইউরোপ মানে ইউরোপীয় ইউরোপ৷ অ্যাংলো-স্যাক্সন সুপিরিয়রিটির কোনও ঠাঁই সেখানে নেই৷ হয় ইউরোপের শর্ত মানুন, নয়তো গোল্লায় যান৷

এখন সেই ছবিটাই যেন বদলে গিয়েছে৷ এখন আর সেই সময়ের ঠান্ডা যুদ্ধ নেই৷ আমেরিকা-সোভিয়েত ইউনিয়ন পরমাণু প্রতিযোগিতা, দুই মহাশক্তির প্রভাব বিস্তারের লড়াই— কোনও কিছুই নেই৷ তা সত্ত্বেও ইউরোপীয় ইউনিয়নে ব্রিটেনের  থাকা না-থাকাটা সেখানে এখন এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার যে, ভারতের মতো দেশেও শেয়ার বাজারের মাথায় হাত৷

একটা ব্যাপার হয়তো ভারতবাসী অনেকেরই জেনে ভালো লাগবে৷ সেদিন দ্য গলের স্বাধীন ইউরোপিয়ান ইউরোপের পক্ষে ছিলেন ফরাসি বিমান প্রস্তুতকর্তা তথা একাধিক সংবাদপত্রের মালিক দাসাউ স্বয়ং৷ তিনি নিজেকে অকপটে গলপন্থী বলতেন৷ সেই দাসাউ কোম্পানির রাফায়েল যুদ্ধবিমানই ভারতে আসছে৷ ভারতীয় বিমান বাহিনীর শক্তি বাড়াতে৷

 

----
-----