মানব গুহ, কলকাতা: টু জি স্পেকট্রাম মামলায় বিশেষ আদালত থেকে বেকসুর খালাস পেয়ে গেলেন সমস্ত অভিযুক্তই৷ আদৌ কি বিচার হয়ে শাস্তির কোন সম্ভাবনা ছিল? ভারতের সমস্ত বড় আর্থিক কেলেঙ্কারিতেই আজ পর্যন্ত শাস্তির তেমন কোন নজির নেই৷ শাস্তি হলেও তা হয়েছে নামমাত্র৷ একনজরে দেখে নেওয়া যাক, ভারতের সবচেয়ে বড় পাঁচটি আর্থিক কেলেঙ্কারির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস৷

১) ভারতীয় কয়লা বণ্টন কেলেঙ্কারি : ১,৮৬,০০০ কোটি টাকার কয়লা বণ্টন কেলেঙ্কারি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সরকারের আমলে সংঘটিত হয়৷ ভারতে টাকার অঙ্কে এটাই এখন অব্দি প্রকাশ্যে আসা সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি৷ সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারের চরমতম নিদর্শন এই কয়লা বণ্টন কেলেঙ্কারি৷ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারি ও আমলারা অনৈতিক ভাবে প্রতিযোগিতামূলক নিলাম বা দরপত্র না ডেকেই যথেচ্ছভাবে সরকারের অধীনে থাকা কয়লাখনিগুলি বণ্টন করেছিলেন৷

Advertisement

১৯৯৪ সাল থেকে ২০১০ পর্যন্ত প্রায় ১৯৪ টি কোল মাইনস বা ব্লক বন্টন করা হয়৷ সঠিক পদ্ধতিতে বণ্টন না হওয়াতে এই খাতে প্রায় ১,৮৬,০০০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারের ক্ষতি হয় বলে রিপোর্ট দেয় The Comptroller and Auditor General বা ক্যাগ৷ সিবিআইয়ের তদন্তে ধরা পরে বিরাট জালিয়াতি৷ ১.৮৬ লক্ষ কোটি টাকার আর্থিক তছরূপের এই মামলায় সম্প্রতি ঝাড়খন্ডের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মধু কোড়া ও অন্যান্য অভিযুক্তদের মাত্র ৩ বছরের শাস্তি ও সামান্য অর্থিক জরিমানা হয়েছে৷

২) টু-জি স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারি : টাকার বিচারে দ্বিতীয় আর্থিক ঘোটালার মামলা৷ ১,৭৬,০০০ কোটি টাকার এই কেলেঙ্কারি ২০০৮ সালে প্রকাশ্যে আসে৷ এই কেলেঙ্কারিও সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারের উজ্জ্বল নিদর্শন৷ এই আর্থিক কেলেঙ্কারির মূল অভিযুক্ত ছিলেন প্রাক্তন টেলিকম মিনিষ্টার এ রাজা৷

ক্যাগ রিপোর্ট অনুযায়ী এ রাজা সব রকম নিয়ম নীতি লঙ্ঘন করে, নিলাম বা দরপত্র না ডেকে, উচিৎ মূল্যে বণ্টন না করে নাম মাত্র মূল্যে টু-জি স্পেকট্রাম লাইসেন্স বণ্টন করেছেন৷ এই কারণে ১.৭৬ লক্ষ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারের ক্ষতি হয়৷ তবে, সিবিআই যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ হাজির করতে পারে নি বলে প্রত্যেক অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস করে দেন বিশেষ আদালতের বিচারপতি ওপি সাইনি৷

৩) ওয়াকফ বোর্ড জমি কেলেঙ্কারি : ২০১২ সালে প্রকাশ্যে আসা এই জমি কেলেঙ্কারির আর্থিক মূল্য প্রায় ১,৫০,০০০ কোটি টাকার উপরে৷ এটিই এখন পর্যন্ত ভারতের সবচেয়ে বড় জমি কেলেঙ্কারির মামলা৷ কর্ণাটক স্টেট মাইনরিটিজ কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান আনোয়ার মনিপাড়ি একটি চাঞ্চল্যকর অভিযোগে জানান যে, কর্ণাটক ওয়াকফ বোর্ড (মুসলিম চ্যারিটেবল ট্রাস্ট) সম্পূর্ণ বেআইনি ভাবে বোর্ডের অধীনে থাকা ২৭০০০ একর জমি বণ্টন বা আত্মসাৎ করেছেন যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১,৫০,০০০ কোটি টাকা৷

ওয়াকফ বোর্ডের অধীনে থাকা জমি দরিদ্র ও নিঃস্ব মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত জনগণের মধ্যে বণ্টন করার কথা৷ কিন্তু অভিযোগ যে বোর্ডের সদস্য, রাজনীতিবিদ ও জমি মাফিয়াদের যোগসাজসে প্রায় অর্ধেক জমি জলের দরে বিক্রি করে দেওয়া হয় অথবা আত্মসাৎ করা হয়৷ শেষ হিসাবে দেখা যায়, এই আর্থিক কেলঙ্কারির ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২ লাখ কোটির কাছাকাছি৷ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এখন পর্যন্ত ভারতের সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির মামলা এটিই৷ এই মামলায় এখনও তদন্ত চলছে৷ কিভাবে সরকারি জমি ফিরিয়ে আনা যায় তার চেষ্টা এখনও চলছে৷

৪) কমনওয়েলথ গেমস কেলেঙ্কারি : ২০১০ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ গেমস আয়োজন উপলক্ষ্যে প্রায় ৭০,০০০ কোটি টাকার মত আর্থিক কেলেঙ্কারি হয়৷ ক্যাগ রিপোর্টে উঠে আসে যে, বরাদ্দকৃত অর্থের মাত্র অর্ধেক পরিমাণ টাকা ভারতীয় খেলোয়ারদের জন্যে খরচ করা হয়েছিল৷ সেণ্ট্রাল ভিজিল্যান্স কমিশনের অনুসন্ধানে কমনওয়েলথ্ গেমস সংক্রান্ত প্রজেক্টে বিভিন্ন রকম তথ্য যথা ভুয়ো সংস্থাকে টাকা প্রদান, বরাদ্দ অর্থ তছরূপ, হিসাব বহির্ভুত খরচা দেখিয়ে টাকা তোলা, ইত্যাদি উঠে এসেছে৷ গেমস পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সরকারী আমলাদের কারুকার্যের ফলেই এসব হয়েছে এমনটাই তদন্তে উঠে আসে৷

অভিযুক্ত হিসাবে কংগ্রেস নেতা ও কমলওয়েলথ আয়োজক কমিটির কর্তা সুরেশ কালমাডি সহ অন্যান্য আমলাদের নাম উঠে আসে৷ ভারতীয় দন্ডবিধির দফা ১২০ বি (Criminal Conspiracy) ও দফা ৪২০ (Cheating) ধারায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা চলছে৷

৫) তেলগি স্ট্যাম্প কেলেঙ্কারি : ২০০২ সালে ২০,০০০ কোটি টাকার এক অভিনব আর্থিক কেলেঙ্কারির কাহিনী প্রকাশ্যে আসে৷ অন্যান্য আর্থিক কেলেঙ্কারি যেমন রহস্য, নাটক ইত্যাদিতে ভরা, তেলগি স্টাম্প কেলেঙ্কারি তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়৷ আব্দুল করিম তেলগি নামক এক ব্যক্তি জাল স্ট্যম্প পেপার ছাপানোর যাবতীয় কলাকৌশল আয়ত্ত্ব করে দীর্ঘদিন ধরে জাল স্ট্যাম্প পেপার ছাপিয়ে ব্যাঙ্ক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে বিক্রি করত৷ দেশের মোট ১২টি রাজ্যে তার এই জালিয়াতি চক্র ছড়ানো ছিল ও আনুমানিক ২০,০০০ কোটি টাকার জাল স্ট্যাম্প পেপার বাজারে ছাড়া হয়েছিল৷

এটা পরে প্রমাণিত হয় যে, জাল স্ট্যাম্প পেপার ছাপানো ও বিক্রির কাজে লিপ্ত বেশ কিছু সরকারী দপ্তর৷ সরকারি কর্মীদের একটা অংশের সমর্থন ছাড়া তেলগির পক্ষে একাজ চালিয়ে যাওয়া কিছুতেই সম্ভব হত না৷ তবে, বিচারে তেলগির ১৩ বছরের সশ্রম কারাদন্ড ও ১০০ কোটি টাকা জরিমানা হয়৷ যদিও ২০১৭ সালে দীর্ঘ রোগভোগের পর তেলগি হাসপাতালে মারা যায়৷

ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জগতে উপরের কেলেঙ্কারিগুলি বিপুল পরিমাণ অর্থ জড়িত বলে সামনের সারিতে স্থান করে নিয়েছে৷ এছাড়াও উল্লেখযোগ্য কেলেঙ্কারি হল, সত্যম কম্পিউটার সার্ভিসেস কেলেঙ্কারি (১৪০০০ কোটি টাকা), বিজয় মালিয়া ব্যঙ্ক প্রতারণা (৯০০০ কোটি টাকা), শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারি (৫০০০ কোটি, হর্ষদ মেহতা জড়িত)  পশুখাদ্য কেলেঙ্কারী (১,০০০ কোটি টাকা, লালুপ্রসাদ যাদব জড়িত), হাওয়ালা কেলেঙ্কারি (১০০ কোটি) ইত্যাদি৷

দেখার জিনিস একটাই, প্রতিটি কেলেঙ্কারিতে কুশীলবের ভূমিকায় আছে রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, সরকারী আমলা বা কোনো বিত্তবান ব্যক্তি বা গোষ্ঠী৷ তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিচারব্যবস্থার অব্যবস্থার সুযোগে আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে গিয়েছেন অভিযুক্তরা৷ কোথাও আবার নামমাত্র শাস্তি পেয়ে বহাল তবিয়তে ফের রাজত্ব করছেন দেশকে প্রতারিত করা প্রতারকরা৷

কথাতেই আছে, Justice Delayed Justice Denied৷ যতদিন না ভারতীয় বিচারব্যবস্থা খুব তাড়াতাড়ি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান দিতে পারবে, ততদিন ভারতীয় রাজনীতির কান্ডারীরা, দেশের আমলারা ও দেশের প্রথম সারির ব্যবসায়ীরা এইভাবেই দেশকে প্রতারণা করতে থাকবেন৷ ক্ষতি হবে দেশের, দেশের মানুষের৷ ফল ভোগ করবে দেশ ও সমগ্র ভারতবাসী৷

----
--