শোভনদেবের সার্বিক জোট তত্ত্ব নিয়ে প্রশ্ন খোদ তৃণমূলের অন্দরে

দেবযানী সরকার, কলকাতা: তবে কি ভবিষ্যৎ পড়ে ফেলেছেন শাসকদলের এরাজ্যের নেতারা? তাই কি গেরুয়া ঝড় রুখতে ‘শত্রুর শত্রু আমার মিত্র’ এই সমীকরণে ভরসা রেখে বামেদের সঙ্গে জোট গড়তে চাইছে শাসক তৃণমূল!

কোনও জল্পনা নয়, তৃণমূলের বর্ষীয়ান নেতা তথা রাজ্যের মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্যকে ঘিরেই রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে৷ প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে দলের অন্দরেও৷ নীচুতলার কর্মীরা বলছেন, ‘‘ক্ষমতার স্বাদ কি এতটাই মিষ্টি যে তাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে সিপিএমের মতো ‘খুনী’ দলের রক্তমাখা হাত ধরতেও একটুও দ্বিধা হচ্ছে না! আমাদের নেতারা কি ভুলে গেল- কেশপুর, সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, নেতাই’য়ের ঘটনা!’’

বুধবার মহাজাতি সদনে সিপিআইয়ের প্রয়াত রাজ্য সম্পাদক প্রবোধ পাণ্ডার স্মরণসভায় যোগ দিয়েছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী শোভনদেব৷ চট্টোপাধ্যায়৷ স্মরণসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে সিপিআই, সিপিএম, আরএসপি, ফরওয়ার্ড ব্লক, এসইউসি, লিবারেশন, পিডিএস সহ বাকি ডজনখানেক বাম দলের নেতাদের চমকে দিয়ে বর্ষীয়ান তৃণমূল নেতা বামেদের সঙ্গে জোটের বার্তা দেন৷ বলেন, ‘‘দেশের অখণ্ডতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার স্বার্থে প্রয়োজনে সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধে উঠে আমাদের সার্বিকভাবে জোটবদ্ধ হওয়ার সময় এসেছে। এজন্য নয়া ইতিহাস রচনাও দরকার হতে পারে!’’

- Advertisement -

যা শুনে কার্যত চেয়ার থেকে পড়ে যাওয়ার হাল হয় বাম নেতাদের! সিপিএমের এক নেতার কথায়, ‘‘এতো ভূতের মুখে রাম নাম!’’ স্বভাবতই, শাসকদলের মন্ত্রীমশাইয়ের এহেন মন্তব্যকে ঘিরে রসালো চর্চা শুরু হয়েছে রাজ্য-রাজনীতিতে৷ যদিও শোভনদেববাবুর জোটবার্তার প্রস্তাবকে পত্রপাঠ বিদায় জানিয়ে বিধানসভার সিপিএমের পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, “তৃণমূলের সঙ্গে জোটের কোনও প্রশ্নই নেই৷ ওরা আগে নিজেদের ঘর সামলাক!”

শুধু বাম নয়, তৃণমূলের অন্দর মহল থেকেও শাসকদলের হেভিওয়েট মন্ত্রীমশাইয়ের এহেন জোট-বার্তা নিয়ে কড়া বার্তা উড়ে এসেছে৷ শাসকদলের নেতা থেকে কর্মী, তাঁদের সাফ কথা-‘‘যাদের বিরুদ্ধে এত লড়াই করে রক্ত ঝরিয়ে আমরা ক্ষমতায় এলাম, তাঁদের সঙ্গে জোট! ক্ষমতায় থাকার স্বাদ কি এতটাই মিষ্টি, যে ওদের ওই রক্তমাখা হাত ধরতেও আমাদের নেতাদের দ্বিধা করছে না৷

নেতারা কি ভুলে গেলেন ছোট আঙারিয়া, কেশপুর, নন্দীগ্রাম, নেতাইয়ের সেই রক্তাক্ত দিনগুলো?’’ প্রশ্ন তুলছেন, ‘‘তাহলে প্রতিবছর ঘটা করে আমরা কেন ২১ জুলাই শহিদ দিবস পালন করি?’’ তাঁরা সরাসরি জানাচ্ছেন, বামেদের ওই রক্তমাখা হাতের সঙ্গে যদি নেতারা হাত মেলান, তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গ-ত্যাগ করতে এক মুহূর্তও সময় নেবেন না তাঁরা৷

অতীতের ইতিহাস বলছে- কেন্দ্রের মসনদ দখল করতে বিজেপি-বিরোধী মহাজোটে সিপিএম সহ বামেদের নেওয়ার বিষয়ে আপত্তি না থাকার কথা শোনা গিয়েছিল খোদ তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখে৷ এমনকী অযাচিতভাবে তিনি ফোন করেছিলেন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরিকেও৷ সেবারও সিপিএম বা অন্যান্য বাম দল তৃণমূলনেত্রীর প্রস্তাবকে পত্রপাঠ খারিজ করে দিয়েছিল। এবারও তাই হল৷

তৃণমূল-স্তর থেকে রাজনীতি করে উঠে আসা দলের রাজ্যসভার সাংসদ শুভাশিস চক্রবর্তীর সাবধানী মন্তব্য, ‘‘আমি দলের মুখপাত্র নই৷ তাই এবিষয়ে আমার মন্তব্য করা অনুচিত৷ তবে ব্যাক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, রাজ্যে সবথেকে বিপদগামী দল কোনটা? সেটা লক্ষ্য রেখে এগোতে হবে৷ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা চলছে৷ আমাদের প্রধান লক্ষ্য দেশে শান্তি অক্ষুন্ন রাখা৷ গণতন্ত্র রক্ষা করা৷ সেক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ দল আমাদের সঙ্গে জোট বাঁধতে চাইলে তাদের স্বাগত৷”

দলের দক্ষ সংগঠক হিসেবে পরিচিত কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলর ও রাজ্যসভার সাংসদ শান্তনু সেন বলছেন, ‘‘সারা ভারতবর্ষের মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখে বিজেপির হাত থেকে নিষ্কৃতি চাইছে৷ সারা দেশকে বাঁচাতে যা প্রয়োজন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাই করবেন৷’’ কিন্তু ৩৪ বছর ধরে যাদের হাত কর্মীরা মার খেল, তাদের হাত ধরতে অসুবিধা হবে না? জবাবে নীরব থেকেছেন তিনি৷ দলের পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলা সভাপতি অজিত মাইতির সাফ কথা, ‘‘বামেদের সঙ্গে জোট বাঁধার প্রশ্নই নেই৷’’ পরক্ষণেই অবশ্য তিনি বলেছেন, ‘‘আমি জেলার নেতা৷ কলকাতার নেতাদের বিষয়ে মন্তব্য করাটা আমার ঠিক হবে না! যা বলার বলবেন দিদি৷!’’

মন্ত্রীমশাইয়ের এহেন রসালো জোট-বার্তার প্রস্তাব প্রসঙ্গে ‘দিদিমণি’ কি বলেন- সেদিকেই তাকিয়ে দলের নীচুতলার কর্মীরা৷

Advertisement
---