মানুষ পাচারের পিছনে কারা, সেটা আগে খুঁজে দেখা দরকার

নেপাল সীমান্ত দিয়ে মানুষ পাচারের ঘটনা যে হারে বাড়ছে তাতে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী সশস্ত্র সীমা বল যথেষ্ট উদ্বিগ্ন৷ তারা জানিয়েছে, এমন বহু কমবয়সী ছেলেমেয়েকে তারা উদ্ধার করেছে যাদের ভারত থেকে নেপালে নিয়ে যাওয়ার মতলবে ছিল পাচারকারীরা৷ দিন যত যাচ্ছে, ভারত-নেপাল সীমান্তে এই ধরনের ঘটনা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে৷ পাচারকারীদের কবল থেকে দুর্গতদের উদ্ধারের পাশাপাশি বহু পাচারকারীকেও পাকড়াও করেছেন সীমা সশস্ত্র বলের জওয়ানেরা৷ সম্প্রতি নেপাল সীমান্ত বরাবর একটা ঝামেলা পাকানোর চেষ্টা যে এই পাচারকারীরাই করেছিল তাতে কোনও সন্দেহ নেই৷ নইলে পারাপারের তুচ্ছ একটা সাঁকো নিয়ে ঝামেলায় কখনও কেউ সশস্ত্র সীমা বলের জওয়ানদের তাঁবুতে আগুন ধরায় না কিংবা তাঁদের উপর চড়াও হয় না৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী

নেপাল সীমান্তের যে অঞ্চলকে এই পাচারকারীরা বেছে নিয়েছে, সেখানে আন্তর্জাতিক সীমানা হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ৷ মূলত এটা ভারত-নেপাল সীমান্তের পূর্বভাগ৷ পাচারকারীরা জানে, এখানে পাহারা তুলনামূলকভাবে অনেক শিথিল৷ তাই তারা এতটা বাড়াবাড়ির সুযোগ পেয়েছে৷ প্রশ্ন হল, এই পাচারকারীরা এত দিন যাদের পাচার করেছে কিংবা করতে গিয়ে ধরা পড়েছে, সেই ব্যক্তিদের গন্তব্য কোথায় ছিল? নিশ্চয়ই শুধু নেপাল নয়৷ তদন্তে আরও অনেক কিছু বেরিয়ে আসবে৷ তবে আমার ধারণা, এভাবে যাদের পাচার করা হয়, ভায়া নেপাল তাদের হয় আরব দুনিয়ায়, নয়তো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনও না কোনও দেশে পাঠানো হয়৷ বিনিময়ে পাচারকারীরা মোটা টাকা পায়৷

একটা সময় আমেরিকায় হিউম্যান ট্রাফিকিং মারাত্মক আকার নিয়েছিল৷ ১৯৮০ দশকের সেই ট্রাফিকিংয়ের নেপথ্যে যারা ছিল, তারা আসলে ড্রাগ মাফিয়া৷ কলম্বিয়া এবং মেক্সিকোর ড্রাগ মাফিয়ারাই মাদক চোরাচালানের পাশাপাশি মানুষ পাচারও করত৷ শুধু তাই নয়, তাদের গোটা কারবারের সঙ্গে কালো টাকা সাদা করা অর্থাৎ মানি লন্ডারিংয়ের কারবারও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল৷ অনেক দিন ধরে লড়াই চালিয়ে তবেই তাদের গোটা কারবারটাকে অনেকখানি কাবু করতে সক্ষম হন আমেরিকার বিভিন্ন দফতরের গোয়েন্দারা৷ এই কাজে তাঁদের দীর্ঘ সময় লাগার একটি বড় কারণ ছিল, মার্কিন গোয়েন্দাদের একটি দফতরের সঙ্গে আর একটি দফতরের সমন্বয়ের অভাব৷ মানে, যাঁরা মাদক-বিরোধী অভিযান চালাচ্ছেন তাঁরা জানতে পারছেন না যে, ওই কারবারের সঙ্গে হিউম্যান ট্রাফিকিংও জড়িয়ে আছে৷ আবার যাঁরা মানি লন্ডারিংয়ের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছেন তাঁরা বুঝছেন না যে, এর সঙ্গে মাদকের কারবারও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে৷ ফলে, এমনটাও বার বার ঘটেছে, এক গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত চালাতে গিয়ে আর গোয়েন্দা দফতরের বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছে৷

- Advertisement -

কিন্তু সেই শিক্ষাও যে পরবর্তীকালে আমেরিকার মতো দেশেও কাজে আসেনি, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের আত্মঘাতী বিমান হামলাই তার প্রমাণ৷ পরবর্তীকালে 9/11 নিয়ে সেদেশে সেনেট কমিটি যে রিপোর্ট দিয়েছিল তাতে স্পষ্ট বলা হয়— আমেরিকার বিভিন্ন গোয়েন্দা দফতরের পরস্পরের মধ্যে সমন্বয়ের যারপরনাই অভাব রয়েছে৷ আর সেই জন্যই 9/11-এর মতো ঘটনা সেখানে ঘটেছে৷

ভারত সরকারেরও মাথায় রাখতে হবে, নেপাল সীমান্তে হিউম্যান ট্রাফিকিংয়ের বাড়বাড়ন্ত কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়৷ মায়ানমার সীমান্ত দিয়ে সোনা চোরাচালানের বাড়বৃদ্ধির মতোই তা বিশাল একটি নেটওয়ার্কের আরও একখানা শুঁড় মাত্র৷ এ প্রসঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক হলেও একটা মজার ব্যাপার মনে পড়ছে৷ রাশিয়ায় ক্ষমতায় থাকার সময় সেদেশের কমিউনিস্ট পার্টি তাদের ২২তম পার্টি কংগ্রেসে স্লোগান তুলেছিল : অল রোডস লিড টু কমিউনিজম৷ তাদের সে আশা পূরণ হয়নি৷ কিন্তু এখন পৃথিবীর যা অবস্থা তাতে যে কোনও দুরাচারেরই শেষ আশ্রয় হল বিশ্বজোড়া সন্ত্রাসবাদ৷ অর্থাৎ, অল ক্রাইমস লিড টু টেররিজম৷ সুতরাং, এক আন্তর্দেশীয় অপরাধের সঙ্গে আর একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রকে আলাদা করে দেখাটা অন্ধের হস্তিদর্শনের শামিল হবে৷

শুধু ভারতের বিভিন্ন গোয়েন্দা দফতর এবং পুলিশের মধ্যেই নয়, বন্ধু দেশগুলির গোয়েন্দাদের সঙ্গেও এ ব্যাপারে তথ্যের আদানপ্রদান অত্যন্ত জরুরি৷ কারণ, সন্ত্রাসবাদের ফণা শুধু ভারত নয়, অন্যান্য দেশকেও এখন বারংবার ছোবল মারছে৷ এমনকী, এক সময় যারা এই সন্ত্রাসবাদীদের পেলেছে-পুষেছে সেই পাকিস্তানও এখন দফায় দফায় সন্ত্রাসে ছিন্নভিন্ন হচ্ছে৷ যদিও তার মধ্যেই তারা তাদের পলিটিক্যাল ডার্টি গেম যথারীতি চালিয়ে যাচ্ছে৷ যে কারণে কূলভূষণ যাদবের গর্দান নিতে তারা ইতস্তত করল না৷ কাশ্মীরে হাঙ্গামাকারীদের উপর নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিচালনার প্রতিশোধ নিল তারা এইভাবে৷

Advertisement ---
---
-----