রূপান্তরকামী সায়ন্তনীই এবার এই শহরে ‘রূপং দেহি’

মেঘ সায়ন্তনী ঘোষ, রাজ্যের প্রথম রূপান্তরকামী মহিলা আইনজীবী৷ সায়ন্তন থেকে সায়ন্তনী, পথটা সহজ ছিল না৷ সামাজিক বাঁধা, কটূক্তি কাটিয়ে সায়ন্তনী সফল৷ সেই খবর আমরা আগেই আপনাদের দিয়েছিলাম৷ এবার সেই সায়ন্তনীই কলকাতার দুটি দুর্গা পুজোর ব্র্যান্ড আ্যাম্বাসাডার৷ অথচ, একটা সময় পুজোর মণ্ডপেও ঢুকতে পারতেন না তিনি৷ বাড়ির জানালা দিয়ে ঢাকের বাদ্যি শুনেছেন কতদিন৷ আজ নিজের পাড়ার পুজোতেই ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার মেঘ সায়ন্তনী, কথা বললেন Kolkata 24×7-এর প্রতিনিধি গৌতমী সেনগুপ্তর সঙ্গে—

1. একই বছরে রাজ্যের প্রথম আইনজীবীর শিরোপা, দুর্গা পুজোর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার, এটা কি সায়ন্তনীর জয় না সমাজের জয়?

সায়ন্তনী: সমাজেরই জয়৷ সায়ন্তনীরা চিরন্তন৷ আছে থাকবে৷ লড়াই তো এখনও চলছে৷ তবে, দুর্গা পুজোয় ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার হতে পেরে আমি খুবই খুশি৷ কারণ, যে ২টি পুজোয় আমি ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার হয়েছি, তার মধ্যে একটি আমারই পাড়ার পুজো৷ সোনারপুর রিক্রিয়েশন ক্লাব তাদের পুজোয় আমায় ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার করেছে৷ যে পুজোয় একটা সময় যেতে পর্যন্ত পারিনি৷ বাড়ি থেকে বেরোলেই বিভিন্ন ভাষার কটূক্তি কানে আসত৷ সেই পুজোরই ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার আমি৷ এখানেই আমার সাফল্য৷

- Advertisement -

2. বাগুইআটি নির্ভীক সংঘের এবারে থিম নারীশক্তি- ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় চোখ’৷ সেই পুজোতেও আপনি ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার৷ নারীশক্তির প্রতিনিধিত্বে আপনি, মনে পড়ে নারী হওয়ার সেই ভীষণ লড়াই?

সায়ন্তনী: সায়ন্তন ঘোষ থেকে আমি আজ মেঘ সায়ন্তনী ঘোষ৷ রূপান্তরকামী মহিলা হওয়ার আগে আমি সমকামী ছিলাম৷ যা মেনে নিতে পারেনি আমার পরিবার, আত্মীয়স্বজন৷ মা ছাড়া কাউকে পাশে পাইনি৷ আত্মীয়দের বাড়ি যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়৷ রূপান্তরকামী মহিলা প্রক্রিয়ার সময়ও নানা লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়েছি, সেখানে নারীশক্তি, নারীর লড়াই তো আমারই লড়াই৷ সেই মান্যতা সমাজ দিয়েছে, সমাজের চোখ আরও খুলুক, বাগুইআটি নির্ভীক সংঘের এবারের থিম সত্যি আমায় বিশেষ সম্মান দিয়েছে৷

3. সমকাম কোনও অপরাধ নয়৷ সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পরও কি সামাজিক প্রতিকূলতা থেকে যাচ্ছে?

সায়ন্তনী: আইনি ভাষা আর সমাজ দুটো ভিন্ন জিনিস৷ সুপ্রিমকোর্টের ঐতিহাসিক রায় আসলে ভালোবাসার অধিকারকে মান্যতা দিল৷ এটা সমাজকে বুঝতে হবে৷ সমকামী, অসমকামী সবাই মানুষ, ভালোবাসার অধিকার সবার৷ সমাজ না বুঝলে এই ঐতিহাসিক রায় গুরুত্ব হারাবে৷ তাই প্রতিকূলতা থাকবেই যতদিন সমাজ চোখ বন্ধ করে থাকবে৷

4. আপনি নিজে নৃত্যশিল্পী, ভারতীয় সংস্কৃতি, ইতিহাসে, স্থাপত্যে সমকাম রীতিমত জ্বল জ্বল করছে৷ অথচ আইনি বাঁধা পেরোতে লেগে গেল ১৫০ বছরের উপর, কোথাও কি আমরা নিজেরই নিজেদের সংস্কৃতিকে অসম্মান করছি?

সায়ন্তনী: আপনি অজন্তা, ইলোড়া, খাজুরাহ মন্দিরের ভাস্কর্যে সমকামী, রূপান্তরকামীদের চিত্রিত করা হয়েছে৷ সেই মন্দিরে পুজোর্চনা চলে, কিন্তু সমাজ সেই বিজ্ঞানসম্মত যৌনতাকেই স্বীকৃতি দিতে লজ্জা পায়৷ ব্রিটিশ শাসকদের জারি করা আইন আমরা এতদিন ধরে রেখেছিলাম৷ অবশ্যই, দেশেরই সংস্কৃতি দীর্ঘ বছর ধরে পদদলিত হয়েছে৷ এখনও হচ্ছে৷ আমি বলব, সমকামী নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের ফলে ভারত আরও একবার স্বাধীন হয়েছে৷ এবার স্বাধীন হোক জটিল সমাজও৷

5. শেষ প্রশ্ন, ব্যক্তি সায়ন্তনী কি এখনও অস্তিত্বের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন?

সায়ন্তনী: লড়াইয়ের শেষ নেই৷ আমার লড়াইও চলছে৷ ২০১২ সালে আইন পাশ করি, ২ বছর পড়াশুনা থামাতে হয়েছিল নিজের অস্তিত্ব খুঁজতেই৷ এত কষ্ট করে পাওয়া অস্তিত্বর উপর আমি খুবই যত্নশীল৷ তাই লড়াইটা চলবেই৷

Advertisement
---