তৃণমূলের গদ্দারদের গর্দান যেতে পারে

আগের লেখায় লিখেছিলাম, ভোটের আগে একটা ব্যাপক হাওয়া তুলে দেওয়া হয়েছিল— এবার যে যে কারণে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় না আসতে পারে, তার একটি হল গোষ্ঠীকলহ৷ গোষ্ঠীকলহের কারণেই তৃণমূল অনেক সিট হারাবে৷ দলের লোকেরাই হারিয়ে দেবে দলের প্রার্থীকে৷ আমরা আগে বার বারই লিখেছি, তৃণমূল পার্টি ওয়ান ম্যান পার্টি৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই শেষ কথা৷ কাজেই যেখানেই যত গোষ্ঠীকলহ থাক না, পার্টির প্রার্থীকে অন্তর্ঘাত করে হারিয়ে দেওয়ার ব্যাপার খুব বেশি হবে না৷ কারণ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটের আগে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন, পার্টির প্রার্থীকে জেতানোর জন্য সবাইকেই বডি ফেলে দিতে হবে৷ যদি তা না হয়, কেউ যদি এই হুঁশিয়ারি অমান্য করে অন্তর্ঘাতের চেষ্টা করে, তাহলে তাকে পার্টি ছেড়ে দেবে না৷ মমতার এই হুঁশিয়ারি ক্ষুব্ধ পার্টিকর্মীদের হুঁশিয়ার করে দিয়েছে৷ এই ভোটে ব্যাপক অন্তর্ঘাত কিছু হয়নি৷ তা হলে, তৃণমূলের আসন সংখ্যা এই জায়গায় পৌঁছাত না৷ তা বলে কি একেবারেই হয়নি? হয়েছে৷ সেই জন্যই কিছু আসন হারাতে হয়েছে তৃণমূলকে৷ না হলে এই সংখ্যাটা আরও কিছু বেড়ে যেত৷

অশোক বসু
অশোক বসু

তৃণমূল কংগ্রেসের গোষ্ঠীকাজিয়া বহু দিন ধরেই লেগে রয়েছে৷ তৃণমূল স্তর থেকেই৷ কাজিয়া যে শুধু তৃণমূলের মধ্যেই তা নয়৷ সম্প্রতি শুরু হয়েছে, তাও নয়৷ বছর তিরিশ আগে থেকেই পরিস্থিতি এমন হয়ে আছে৷ সিপিএমের মধ্যেও গোষ্ঠীকাজিয়া কম ছিল না৷ পাওয়া না-পাওয়া, খাওয়া না-খাওয়া নিয়ে দলের মধ্যে কাজিয়া লেগেই থাকত৷তবে সিপিএম রেজিমেন্টেড পার্টি৷ দলের রাশ নেতৃত্বের হাতেই থাকত৷ তাই, তৃণমূলের ক্ষেত্রে কাজিয়া ব্যাপারটা যতটা প্রকট মনে হয়, সিপিএমের ক্ষেত্রে তা হত না৷ এখন অবশ্য হয়৷ তবে পার্টিই যখন অস্তিত্বহীন তখন গোষ্ঠীবাজি করে কী লাভ? একটা ছোট ঘটনার কথা বলি৷ উত্তর শহরতলির দুটি ছেলেকে আমি চিনতাম৷ ধরা যাক, তাদের নাম কালু আর শিবু৷ দুজনেই ছিল পার্টির জন্য নিবেদিত৷ সকালবেলা বাড়ি বাড়ি খবরের কাগজ দিত, আর সারা দিন পার্টি করত৷ পার্টির যখন অবস্থা ভালো হল, পার্টি ভাঙিয়ে খাওয়ার মতো পরিস্থিতি যখন এল তখন আস্তে আস্তে শিবুর অবস্থা ফিরতে লাগল৷ বাড়ি হল৷ গাড়ি হল৷ বাস হল৷ ব্যাবসা হল৷ কালু যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই পড়ে থাকল৷ পরের দিকে পার্টির দয়ায় অল্প কিছু রোজগারের ব্যবস্থা হয়েছিল কালুর৷ তৃণমূল হলে শিবু বনাম কালুর দলে কাজিয়া লেগে থাকত৷ সিপিএম বলে হয়নি৷ তৃণমূলে অবাধ স্বাধীনতা৷ যে যা খুশি তা-ই করতে পারে৷ যা খুশি তা-ই বলতে পারে৷ একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নজরে এলেই সেসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়৷ না হলে হয় না৷ তাই মমতার হুঁশিয়ারি থাকায় ভোটের আগে মুখে যে যাই বলুক, অভিমান করে বা পার্টিকে টাইট দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে কেউ দূরে সরে থাকলেও ভোটের সময় তাদের পার্টির প্রার্থীকে জেতানোর জন্যই ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছে৷ ফলও পার্টি পেয়েছে৷

কিন্তু, ব্যাপক না হলেও গোষ্ঠীবাজির কিছু খেসারত তো তৃণমূলকে দিতেই হয়েছে৷ একটা আসনের কথা তো আগের লেখাতেই উল্লেখ করেছি৷ অনুব্রত মণ্ডল বনাম কাজল শেখের কাজিয়ায় নানুর আসনটি হাতছাড়া হয়েছে তৃণমূলের৷ আরও কয়েকটি আছে, যেখানে এমন ঘটনা ঘটেছে৷ তবে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ হয়েছে মালদহে৷ ফল বেরনোর আগেই এমনটা যে হবে, তার আভাস দিয়েছিলাম৷ যদিও ফল বেরনোর দুদিন আগে সাবিত্রী মিত্র-র সঙ্গে দেখা হয়েছিল৷ বেলভিউ ক্লিনিকে ভরতি ছিলেন৷ তখন অবশ্য তাঁকে দেখে মনে হয়নি, এই রকম একটা অবস্থার মধ্যে পড়তে চলেছেন উনি৷ বেশ হাসিখুশিই ছিলেন৷ মনে হচ্ছিল যেন, উনি আগাম জেনে বসে আছেন যে, জিতেই গিয়েছেন৷ এমনিতেই উত্তরবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস কিছুটা কমজোর৷ মালদহে তো বটেই৷ মালদহে এখনও এবিএ গনিখান চৌধুরী মিথ৷ তার মধ্যেও আগের ভোটে মালদহ থেকে জিতে দুজন মন্ত্রী হয়েছিলেন৷ একজন সাবিত্রী মিত্র৷ গনিখানের অপার স্নেহ যাঁর উপর বর্ষিত হয়েছে৷ সাবিত্রী মিত্র জিতে এসেছেন গনিখানের লোক বলেই৷ আর একজন কৃষ্ণেন্দুনারায়ণ চৌধুরী৷ তিনিও গনিখানের হাতে তৈরি৷ নিজেরও প্রভাব তাঁর কম নেই৷ সেই দুজনই এবার হেরে গিয়েছেন৷ দার্জিলিং ছাড়া রাজ্যের আর একটি মাত্র জেলাতেই তৃণমূল শূন্য৷ সেটি মালদহ৷ দার্জিলিংয়ে যে ছটি আসনের একটিও তৃণমূল এবার পাবে না, তা অনেক আগেই বোঝা গিয়েছিল৷ ফলে দার্জিলিংকে তালিকার বাইরেই রাখা হয়েছিল৷ কিন্তু ভাবা যায়নি, মালদহে তৃণমূল শূন্য হয়ে যাবে৷ বিদায়ী মন্ত্রিসভায় যে জেলার দু’-দুজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন৷ দুজনেই হেরেছেন গোষ্ঠীকলহে৷ ওঁরা স্বীকার না করলেও সবাই জানে, ওঁরাই একে-অপরকে হারিয়েছেন৷ দুজনেই ভেবেছিলেন, আমিই একেশ্বর হব৷ ফল, দুজনেই পপাত ধরণীতলে৷

- Advertisement -

আগেও বলেছিলাম, আবারও বলি৷ গদ্দারি করলে গর্দান যাবে৷ ঠিক এই ভাষায় না বললেও মমতার হুঁশিয়ারি ছিল এমনই৷ বিজয়ী বিধায়কদের নিয়ে প্রথম বৈঠকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই ইঙ্গিতই আবার দিয়েছেন৷ অন্তর্ঘাতের ফলে কোথায় পার্টির প্রার্থী হেরেছে, তার খোঁজ নিচ্ছেন৷ অবধারিত গদ্দারদের বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই কড়া ব্যবস্থা নেবেন তিনি৷ গদ্দারদের কারও কারও হয়তো গর্দানও যাবে৷
(লেখক ‘বর্তমান’ পত্রিকার প্রাক্তন কার্যনির্বাহী সম্পাদক এবং ‘সংবাদ প্রতিদিনে’র প্রাক্তন সহযোগী সম্পাদক)

Advertisement
---