সুমন বটব্যাল, কলকাতা: সদ্য সমাপ্ত পঞ্চায়েত নির্বাচনে জঙ্গলমহল, বিশেষত পুরুলিয়া ও ঝাড়গ্রামে গেরুয়া ঝড় এমনিতেই শাসকদলের কপালের ভাঁজ চওড়া করেছিল৷ তার ওপর বৃহস্পতিবার পুরুলিয়ার শিমুলিয়ায় অমিত শাহর জনসভায় লাখো মানুষের সমাগমের জেরে বেশ চাপে শাসকদল৷

সেই অর্থে জঙ্গলমহলে সংগঠন না থাকা সত্ত্বেও বিজেপি কিভাবে লাখো মানুষকে হাজির করালো তা দলীয়স্তরে খতিয়ে দেখছেন শাসকদলের নেতৃত্বরা৷ অকপটে সেকথা স্বীকারও করে নিয়েছেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা পুরুলিয়া জেলা তৃণমূলের সভাপতি শান্তিরাম মাহাতো৷

আরও পড়ুন: নদীবক্ষে রয়্যাল বেঙ্গল পেটানোর তদন্ত শুরু বন দফতরের

তিনি বলেন, ‘‘ওরা ঝাড়খন্ডের বোকারো, আসানসোল ও দুর্গাপুর থেকে প্রচুর মানুষকে সমাবেশে এনেছিল৷ কিছু স্থানীয় মানুষও ছিলেন৷ তবে জঙ্গলমহলের মানুষ কেন বিজেপির দিকে ঝুঁকছে তা আমরা দলীয়স্তরে খতিয়ে দেখছি৷’’

একই সঙ্গে তাঁর স্বীকারোক্তি, ‘‘নিচুতলায় আমাদের কিছু সাংগঠনিক ত্রুটি রয়ে গিয়েছে৷ সেই সুযোগটাকেই বিজেপি কাজে লাগিয়েছে৷ আমরা সাংগঠনিক ত্রুটিগুলি চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি৷’’ নিচুতলার একাংশ নেতৃত্বর আচার, আচরণ, জীবন যাত্রার মানও যে ভোট বাক্সে বিরূপ প্রভাব তৈরি করেছে, তাও অকপটে মেনে নিয়েছেন শান্তিরামবাবু৷

প্রসঙ্গত,সদ্য সমাপ্ত ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচনে রাজ্য জুড়ে শাসকদলের জয়ের ধারা অব্যহত থাকলেও তা ভীষণভাবে ধাক্কা খেয়েছে জঙ্গলমহলে৷ বিশেষত, ঝাড়গ্রাম ও পুরুলিয়া জেলায়৷ ঝাড়গ্রামের মতো ছোটো জেলায় ৩টি পঞ্চায়েত সমিতি ও একাধিক গ্রাম পঞ্চায়েত দখল করেছে বিজেপি৷

আরও পড়ুন: উপত্যকায় পাথর যুদ্ধ রুখতে তৈরি মহিলা CRPF

পুরুলিয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের সাফল্যের হার আরও বেশি৷ পাহাড়ে জঙ্গলে ঘেরা পিছিয়ে পড়া জেলা পুরুলিয়ার ১৭০টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে তৃণমূল জয়ী হয়েছে ৬৩টিতে৷ সেখানে বিজেপি দখল করেছে ৪৪টি গ্রাম পঞ্চায়েত৷ সিপিএম ও কংগ্রেস যথাক্রমে ৩ ও ৯টি গ্রাম পঞ্চায়েত দখল করেছে৷ অন্যদিকে ৫১ টি গ্রাম পঞ্চায়েত কার্যত ত্রিশুঙ্কু হয়ে রয়েছে৷

একইভাবে জেলার ২০টি পঞ্চায়েত সমিতির মধ্যে তৃণমূল ৮ ও বিজেপি ৪টি দখল করেছে৷ ত্রিশুঙ্কু হয়ে রয়েছে ৮টি পঞ্চায়েত সমিতি৷ জেলা পরিষদের মোট ৩৮টি আসনের মধ্যে তৃণমূল ২৬, কংগ্রেস ৩ ও বিজেপি ৯টিতে জয়ী হয়েছে৷

আরও পড়ুন: ১০ লক্ষ সমর্থকের প্রার্থনা নিয়ে মাঠে নামবে আর্জেন্তিনা

একান্ত আলাপচারিতায় শাসকদলের নেতারা মেনে নিচ্ছেন, গত ১ বছর ধরে তলে তলে এলাকা জনসংযোগ গড়ে তুলেছে গেরুয়া শিবির৷ অন্যদিকে স্থানীয়স্তরের একাংশ তৃণমূল নেতার রাতারাতি আর্থিকভাবে ফুলেফেঁপে ওঠার বিষয়টিকে ভালো ভাবে নেননি জঙ্গলের বাসিন্দারা৷ তারই জেরে জঙ্গলমহলে গেরুয়া উত্থান বলে মনে করছেন শাসকদলের নেতারা৷

শুধু জঙ্গলমহলে সাফল্যই নয়, পুরুলিয়ার শিমুলিয়ায় অমিত শাহর জনসভায় যেভাবে লাখো মানুষের সমাগম হয়েছে, তা নিয়েও যথেষ্ট চিন্তিত শাসকদল৷ প্রকাশ্যে তাঁরা ‘ওরা বাইরে (ঝাড়খন্ড) থেকে লোক এনেছে’ বলে দাবি করলেও একান্ত আলাপচারিতায় শাসকদলের নেতৃত্বরা মানছেন, জনসভায় হাজির হওয়া মানুষের সিংহভাগই ছিলেন স্থানীয়৷

আরও পড়ুন: জল জটে কলকাতা, বন্ধ জল সরবরাহ

বিজেপির জেলা সভাপতি বিদ্যাসাগর চক্রবর্তী বলেন, ‘‘শাসকদলের অত্যাচারে, পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতির ঘটনায় জঙ্গলমহলের মানুষ তিতিবিরক্ত৷ তাঁরা সকলেই বিজেপিতে যোগ দিতে চাইছেন৷ সেকারণেই অমিত শাহর জনসভায় লাখো মানুষকে হাজির করানো সম্ভব হয়েছিল৷ আগামীদিনে জঙ্গলমহল থেকে শাসকদল মুছে যাবে৷’’

সূত্রের খবর, জঙ্গলমহলে পঞ্চায়েতের ফলাফল নিয়ে রীতিমতো ক্ষুব্ধ স্বয়ং দলনেত্রী৷ ঘনিষ্ঠ মহলে এবিষয়ে তিনি একাধিকবার ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন৷ কারণ, ঘনিষ্ঠমহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন- তিনি সবচেয়ে বেশি বার জঙ্গলমহলে গিয়েছেন৷ রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উন্নয়নের কর্মকান্ডও হয়েছে জঙ্গলমহলে৷ জঙ্গলমহলের সিংহভাগ বাসিন্দাই কোনও না কোনও সরকারি প্রকল্পে সুফলও পেয়েছেন৷

আরও পড়ুন: বর্ষা-বন্যায় বিপর্যস্ত কাশ্মীরে স্থগিত অমরনাথ যাত্রা

তা সত্ত্বেও জঙ্গলের বাসিন্দারা কেন শাসকদলের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি৷ এমনকি আদিবাসী উন্নয়ন দফতরটি জেমস কুজুরের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে নিজের হেফাজতে রেখেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ এখন দেখার শাসকের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া জঙ্গলমহলের বাসিন্দাদের ফের নিজেদের দিকে টানতে পারেন কি না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ নাকি জঙ্গলমহলে গেরুয়া উত্থান আরও বৃহত্তর আকার নেয়৷ আপাতত সেদিকেই নজর রাখছেন রাজ্য রাজনীতির কারবারিরা৷

--
----
--