রাস্তার সারমেয়-মার্জারের জন্য জলাঞ্জলি তরুণ-তরুণীর ভবিষ্যৎ

বিশ্বজিৎ ঘোষ, কলকাতা: রাস্তার সারমেয় এবং মার্জারদের জন্য তাঁরা যদি তাঁদের নিশ্চিত ভবিষ্যৎ জলাঞ্জলি না দিতেন, তা হলে হয়তো রাস্তার এক সারমেয়র চিকিৎসায় ঘটত না মিরাকল৷ রাস্তার সারমেয় এবং মার্জারদের জন্য তাঁরা যদি জারি না রাখতেন তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থা, তা হলে হয়তো রাস্তার এক সারমেয়র পরিচয় হত না অভিমন্যু৷

আরও পড়ুন: মানুষের খাদ্য হিসেবে নিখোঁজ হচ্ছে রাস্তার সারমেয়রা!

তবে, শুধুমাত্র যেমন তাঁদের নিশ্চিত ভবিষ্যৎ জলাঞ্জলি দেওয়া নয়৷ তেমনই, শুধুমাত্র আবার রাস্তার সারমেয়-ও নয়৷ কেননা, সারমেয়র পাশাপাশি যেমন রয়েছে রাস্তার মার্জার৷ তেমনই পাখি-ও রয়েছে৷ এবং, রাস্তার সারমেয় আর মার্জারের পাশাপাশি পাখির জন্যও তাঁরা যে হাসপাতাল গড়ে তুলেছেন, তার জন্য যেমন তাঁদের পেরোতে হয়নি কম পথ৷ তেমনই, এই হাসপাতালের জন্য আবার কম বাধাও অতিক্রান্ত করতে হয়নি তাঁদের৷ সব মিলিয়ে, রাস্তার সারমেয় এবং মার্জারদের জন্য বড় মাপের হাসপাতাল গড়ে তোলা-ই এখন তাঁদের স্বপ্ন৷

আরও পড়ুন: মানুষের কাছে ধর্ষণের শিকার রাস্তার প্রসূতি-সারমেয়

যদিও, নিশ্চিত ভবিষ্যতের সংজ্ঞা অবশ্য বদলে যায় স্বপ্নসন্ধানীদের কাছে৷ না হলে, স্বপ্নের যেমন অপমৃত্যু ঘটত৷ তেমনই আবার, অন্য পাঁচ জনের মতো গড়পড়তা জীবনযাপনের সঙ্গে স্বপ্নসন্ধানীদের মধ্যে কোনও ফারাকও থাকত না৷ যে কারণেই না, গড়পড়তা জীবনযাপনের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি নিশ্চিত ভবিষ্যৎ, রাস্তার সারমেয় এবং মার্জারদের জন্য সেই নিশ্চিত ভবিষ্যৎ-ই হেলায় জলাঞ্জলি দিতে পেরেছেন কলকাতার এই তরুণ এবং তরুণী৷ এই দুই স্বপ্নসন্ধানীর এক জন সোমক চট্টোপাধ্যায় এবং অন্য জন, তিতাস মুখোপাধ্যায়৷

আরও পড়ুন: ফোঁটা পেল বোনদের ভুলে না যাওয়া সারমেয়-ভাই

বি টেক-এর পরে অন্য পাঁচ জনের মতো সোমক চট্টোপাধ্যায়-ও শুরু করেছিলেন চাকরি জীবন৷ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তখন তাঁর সফল কেরিয়ারে রয়েছে উজ্জ্বল তথা নিশ্চিত ভবিষ্যৎ৷ কিন্তু, রাস্তার সারমেয় এবং মার্জারদের জন্য বছর ছয়েক পরে চাকরি জীবনের ইতি টানেন তিনি৷ আর, তিতাস মুখোপাধ্যায়? নিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য যদিও তিনি এখনও চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট (সিএ)-এর ছাত্রী৷ কিন্তু, রাস্তার সারমেয় এবং মার্জারদের জন্যই, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টের পড়ুয়া হিসেবে তিতাস মুখোপাধ্যায়ের ভবিষ্যৎ-ই এখন অনিশ্চিত৷arc-02

আরও পড়ুন: রাস্তার সারমেয় খুনের জেরে চাপে পড়ে তদন্তে পুলিশ

কারণ, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট-এর পাঠ সম্পূর্ণ করার তুলনায়, রাস্তার সারমেয় এবং মার্জারদের চিকিৎসা এবং তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করার বিষয়টি তাঁর কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ৷ তিতাস মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘সি এ নিয়ে এখন ভাবছি না৷ পরেও কমপ্লিট করে নিতে পারব৷’’ এক সময় রাস্তায় রাস্তায় কলকাতার এই দুই স্বপ্নসন্ধানী চিকিৎসা করেছেন কোনও না কোনও সারমেয়কে৷ ওই সব সারমেয়র জন্য খাবারের ব্যবস্থাও করেছেন তাঁরা৷ তার পরে এই কাজ তাঁরা করেছেন প্রতিদিন প্রতি সারমেয়র জন্য ১০০ টাকা ঘর ভাড়া দিয়ে৷ তবে, সেখানে ২৪ ঘণ্টা তাঁরা থাকতে পারতেন না৷

আরও পড়ুন: সন্তানের পরিচয় জানাতে প্রথমেই আসুক মায়ের নাম!

যে কারণে, শেষ পর্যন্ত সোমক চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতেই তাঁরা গড়ে তুলেছেন হাসপাতাল৷ যেখানে সারমেয় এবং মার্জার মিলিয়ে ৩০-৩৫ জনের জন্য চিকিৎসার পাশাপাশি পথ্য অর্থাৎ, খাবারের ব্যবস্থাও তাঁরা করেছেন৷ সোমক চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘বাড়িতে এই ব্যবস্থা করতে পারার জন্য আমার বাবার অবদানও রয়েছে৷’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘প্রতি বছর একটা করে টার্গেট নিয়ে এগোচ্ছি৷ এই বছরের টার্গেট ছিল অ্যাম্বুল্যান্স৷ এটা পূরণ হয়েছে৷ রাস্তার কুকুর, বিড়ালের চিকিৎসার জন্য সামনের বছর বড় সেন্টার চালুর টার্গেট রয়েছে৷’’ শুধুমাত্র তাই নয়৷ তিনি বলেন, ‘‘রাস্তার কুকুরদের নির্বিজন করার কাজও আমরা করছি৷ দেখা যাক, এই কাজে সরকারি সহায়তা পাওয়া যায় কি না৷’’

আরও পড়ুন: সরকারি নির্দেশেই অকেজো মাল্টি-সুপার হাসপাতাল

রাস্তার কোনও কোনও সারমেয়কে সুস্থ করে তোলার জন্য কয়েক মাসও রাখতে হয় এই দুই স্বপ্নসন্ধানীর হাসপাতালে৷ তেমনই, শুধুমাত্র আবার রোগনির্ণয় এবং ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসাও নয়৷ প্রয়োজনে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থাও করতে হয়৷ যদিও, কলকাতায় এমন অনেকেই রয়েছেন, যাঁরা রাস্তার সারমেয়দের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন৷ এবং, এই শহরে এমন বিভিন্ন স্থান-ও রয়েছে, যেখানে প্রয়োজনে রাস্তার কোনও সারমেয়র জন্য অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থাও হয়৷ তবে, কলকাতার এই তরুণ এবং তরুণীর হাসপাতালে রাস্তার এমন অনেক সারমেয়র ক্রিটিক্যাল অপারেশন হয়েছে, যে সব কলকাতার অন্যত্র এখনও হয়নি৷ আর তারই জেরে রাস্তার এক অচেনা সারমেয়র নাম-ও হয়ে গিয়েছে মিরাকল!

আরও পড়ুন: সারদাকাণ্ডে এক সাংবাদিকের আত্মহত্যা এবং মিডিয়া

কারণ, ওই সারমেয়র চিকিৎসায় মিরাকল-ই ঘটেছে৷ যার জেরে প্রাণ-ও ফিরে পেয়েছে মিরাকল৷ ওই সারমেয় অবশ্য এখনও কেমো থেরপির মধ্যই রয়েছে৷ কিন্তু, প্রায় দুই মাস আগে যে অবস্থায় ওই সারমেয়র চিকিৎসা শুরু হয়েছিল এই তরুণ এবং তরুণীর হাসপাতালে, সেই সময় তার বাঁচার আশা ছিল না৷ কেননা, ওই সারমেয়র নাকের কাছে যে টিউমার হয়েছিল, সেটি ফেটে গিয়েছিল৷ এবং, ওই অবস্থায় প্রায় আড়াই মাস অন্যত্র তার চিকিৎসাও চলছিল৷ অথচ, ওই চিকিৎসায় তার অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি৷ বরং, টিউমারের ক্ষত স্থানে ম্যাগোট হয়ে গিয়েছিল৷ স্বাভাবিক ভাবেই, ম্যাগোটের জেরে ওই সারমেয়র অবস্থা কঙ্কালসার হয়ে উঠছিল৷ কিন্তু, তাঁদের চিকিৎসা ব্যবস্থায় শেষ পর্যন্ত ম্যাগোট-এর সংক্রমণ থেকে মুক্ত হয়েছে ওই সারমেয়৷

আরও পড়ুন: প্রথার নামে প্রকাশ্যে গণধর্ষণ যেখানে এখন এক খেলা!

সোমক চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘আমরা যখন ওই কুকুরটির চিকিৎসা শুরু করলাম, তখন ওর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার মতো অবস্থা৷ ওর চিকিৎসায় মিরাকল ঘটেছে বলেই ওর নাম এখন মিরাকল৷’’ এর আগে বেঙ্গালুরু এবং চেন্নাই-এর একটি করে এই ধরনের ঘটনা ছাড়া এ দেশের অন্যত্র এমন মিরাকল প্রকাশ্যে আসেনি বলে জানা গিয়েছে৷ আর, অভিমন্যু? কোনও কারণে রাস্তার অচেনা এই সারমেয়র মাথায় আঘাত লেগেছিল৷ তবে, ওই আঘাতের মাত্রা এতটাই বেশি ছিল যে, তার জেরে ওই সারমেয়র মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছিল৷ তার একটি চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে এসে ঝুলছিল৷ যদিও, ওই চোখের দৃষ্টিশক্তি ফেরানো আর সম্ভব হয়নি৷ তবে, অপারেশনের মাধ্যমে ঝুলে থাকা ওই চোখকে যথাস্থানে স্থাপন করা সম্ভব হয়েছিল৷

আর, এ ভাবেও, গড়পড়তা জীবনযাপনের জন্য নিশ্চিত ভবিষ্যৎ জলাঞ্জলি দিয়ে, অন্য এক ভবিষ্যতের লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছেন কলকাতার এই দুই স্বপ্নসন্ধানী৷arc-03

_____________________________________________________________________

আরও পড়ুন:
(০১) তৃণমূল কংগ্রেস চাইলে দলের ব্যানারেই সবক শেখাতো ছাত্রীকে!
(০২) ফেসবুকে হরিবোল!! ছাত্রীকে ‘সবক’ শেখাল তৃণমূলের ‘কমিটি’
(০৩) রাস্তার এক হাজার সারমেয়র জন্য বিজয়া দশমীর মাংস-ভাত
(০৪) ত্রিপুরার যৌনকর্মীদের জন্য স্পনসর চাইছে বাংলার দুর্বার
(০৫) মুখ্যমন্ত্রীর দুর্নাম হচ্ছে! তৃণমূল-সংগঠনের নিশানায় স্বাস্থ্য দফতর
(০৬) অধীরের আর্জিতে ‘সাজানো ঘটনা’র প্রায়শ্চিত্ত করবেন মমতা!!
(০৭) শান্তির খোঁজে মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে যৌনকর্মীদের পুজোর টাকা
(০৮) Auto-Crazy যাত্রীর জন্যই চালক জারি রাখে Autocracy
(০৯) সিলেবাসে চাই ওষুধবিজ্ঞান, পাঠে মগ্ন স্কুল-পড়ুয়ারা
(১০) কপাল পোড়াদের জীবনে এক বারই আসে প্রেম!

_____________________________________________________________________

Advertisement
---
-----