গুয়াহাটি: নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের প্রতিবাদে অসম আরও উত্তাল। বিক্ষোভ আটকাতে বিজেপি পরিচালিত রাজ্য সরকার জারি করেছে ১৪৪ ধারা। গ্রেফতার বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী। তার পরেই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরির হুমকি এল বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আলফা (স্বাধীনতা) সুপ্রিম কমান্ডার পরেশ বড়ুয়ার তরফে।

গোয়েন্দা বিভাগ আগেই রিপোর্ট দিয়েছে এই মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি নেতা এখন চিনের রুইলি শহরে তার ঘাঁটিতেই রয়েছে। যদিও প্রায়ই তার আনাগোনা হয় মায়ানমারের কাচিন প্রদেশে।

হুমকির পাশাপাশি বিবৃতি জারি করেছে আলফা(স্বাধীনতা)। সংগঠনের চেয়ারম্যান অভিজিৎ অসমের তরফে সেই বিবৃতিতে রাজ্য সরকার ও মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোওয়ালের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে অসমের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ড. হীরেন গোঁসাইকে গ্রেফতারের প্রতিবাদ জানানো হয়।

নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (২০১৬)

ভারতের প্রতিবেশী বিভিন্ন মুসলিম জনসংখ্যা বহুল দেশগুলি যেমন বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, পাকিস্তান থেকে অমুসলিম কেউ সরাসরি ভারতের নাগরিকত্ব পেতে চাইলে এবার আবেদন করতে পারবেন। চাইলেই ওই অমুসলিম ব্যক্তিকে নাগরিকত্ব প্রদান করা হবে। কিন্তু মুসলমান হলে তাঁর ক্ষেত্রে এমনটা করা হবে না। বিলে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী এই সব দেশে ধর্মীয় সন্ত্রাসের কারণে কোনও অমুসলমান ভারতে থাকার আবেদন করতে পারবেন।

বিরোধ কোথায়:

অসম সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলির দাবি, এর ফলে বাংলাদেশ থেকে একটি বড় অংশের হিন্দুরা সরাসরি ভারতে আশ্রয় নেবেন। তাতে স্থানীয় জাতিগোষ্ঠী প্রবল অসুবিধার মধ্যে পড়বে। এতে বাড়বে জাতিগত সংঘাত।

অশান্ত উত্তর পূর্বাঞ্চল:

নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের প্রতিবাদে গত ৪৮ ঘণ্টা ধরে প্রবল উত্তপ্ত উত্তর পূর্ব ভারত। অসম, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড, মনিপুর, মিজোরাম, অরুণাচল প্রদেশ, মেঘালয়ের সর্বত্র পালিত হয়েছে বনধ। একদিকে ১২ দফা দাবি সহ বাম এবং একাধিক কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নের ডাকা ভারত বনধের প্রভাব পড়েছিল। তারই পাশাপাশি চলছিল নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরোধিতায় বিক্ষোভ। এর জেরে পশ্চিম ত্রিপুরার মাধববাড়িতে বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালায় পুলিশ। সেখানকার পরিস্থিতিও উত্তপ্ত।

অশান্ত অসম:

আর অসমে চলছে ক্রমাগত বিক্ষোভ। ডিব্রুগড়, দরং, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিমধ্যেই পঠন-পাঠন বর্জন করেছেন পড়ুয়ারা। বিভিন্ন আদালতের আইনজীবীরা প্রকাশ্যেই কর্মবিরতি পালন করেন। বনধ পরবর্তী সময়ে রাজ্যের একাধিক স্থানেও বিক্ষোভ সমানে চলছে। জাতীয় সড়ক ও রাজ্য সড়ক অবরোধ করা হয়েছে। অসমের বুদ্ধিজীবী, কবি-সাহিত্যিকরা কেন্দ্রীয় সরকারের নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের প্রতিবাদে সরব হয়েছেন।

পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয় বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ড. হীরেন গোঁসাইকে দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করার পর। পুরো অসমীয়া সমাজ ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। বৃহস্ফতিবার বেলা গড়াতেই গুয়াহাটি, কোকরাঝাড়, বঙ্গাইগাঁও, শিলচর, হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ উত্তপ্ত হতে শুরু করে।

যদিও অসমের পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে দাবি করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং।তবে তাঁর দাবিকে উড়িয়ে দিয়েই বিক্ষোভ আরও ছড়াতে শুরু করেছে। এমনই অবস্থায় মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোওয়ালের নিরাপত্তা আরও বাড়িয়েছে সরকার। তিনি দিল্লিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন।

এদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আলফা (স্বাঃ) হুমকি দেওয়ার পর সন্ত্রস্ত হতে শুরু করেছে পরিবেশ।

সম্প্রতি দুর্গাপুজোর সময় গুয়াহাটির পান বাজারে বিস্ফোরণ ঘটায় আলফা। দাবি করা হয়, এটি ছিল জাতীয় নাগরিক পঞ্জির অন্তর্গত করা অ-অসমীয়াদের রাজ্যে স্থান দেওয়ার বিরোধিতা। সেই বিস্ফোরণের পর পরই তিনসুকিয়ায় হয় ভয়ঙ্কর জঙ্গি হামলা। তাতে ৫ বাঙালিকে খুন করা হয়। এর জেরে আরও উত্তপ্ত হয় পরিস্থিতি। সেই ঘটনার পরেই শিবসাগরে বোমা নিয়ে হামলা হয়। হামলার জেরে উত্তপ্ত অবস্থায় অসম জুড়ে বিক্ষোভ চলাকালীন কাছাড়ে প্রকাশ্যেই জঙ্গিরা তোলা আদায় করতে এলে গণপ্রহার করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র।

এবার নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরুদ্ধে অসমে ফের নাশকতার হুমকি দিয়ে আলফা আরও ঘোরালো পরিবেশ তৈরি করল। প্রশাসনের তরফে জারি হয়েছে কড়া সতর্কতা। থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে আলফার আত্মসমর্পণকারী শীর্ষ নেতা গোলাপ বড়ুয়া ওরফে অনুপ চেতিয়াকে।

একসময় পরেশ বড়ুয়ার অন্যতম ছায়াসঙ্গী অনুপ চেতিয়া দীর্ঘদিন বাংলাদেশে আত্মগোপন করে। পরে তাকে ভারতের হাতে প্রত্যর্পণ করে বাংলাদেশ সরকার।

--
----
--