নবাব সিরাজের বংশধর উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী

সৌমেন শীল: ময়মনসিংহের জমিদার শ্রীকৃষ্ণ রায়চৌধুরীর দুই পুত্র দত্তক নিয়েছিলেন মাধবি তথা আলেয়ার গর্ভজাত সিরাজ পুত্রকে। সিরাজ পুত্রের নয়া নামকরণ হয় যুগলকিশোর রায়চৌধুরী। এভাবেই নতুন করে যাত্রা শুরু করে মুর্শিদাবাদের নবাব সিরাজ উদ দৌলার বংশ। যা অনেকেরই অগোচরে ছিল। সেনাপতি মোহনলালের দুই বিশ্বস্ত সঙ্গী বাসুদেব এবং হরনন্দ ছাড়া এই বিষয়ে কেউই কিছু জানতেন না।

আরও পড়ুন- ধর্মান্তরিত হয়ে এখনও বাংলায় বিরাজ নবাব সিরাজের বংশধর

শ্রীকৃষ্ণ রায়চৌধুরীর পুত্র কৃষ্ণগোপাল দু’বার বিয়ে করলেও কোনও সন্তান হয়নি। তাঁর পরিবারেই বড় হয়ে ওঠেন যুগলকিশোর রায়চৌধুরী। শুধু তাই নয় বেশ দাপটের সঙ্গেই সামাল দিয়েছেন ময়মনসিংহের জমিদারি। যদিও পরবর্তী সময়ে কৃষ্ণগোপালবাবুর দুই স্ত্রী যুগলকিশোরের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে অবগত হন। এবং বিরোধ শুরু হয়। যা আদালত পর্যন্ত গড়ায়।

- Advertisement -

এই সময়েই নিজের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে জানতে পারেন যুগলকিশোর চৌধুরী। জানতে পারেন তিনি আসলে নবাব সিরাজ উদ দৌলার পুত্র। তাঁর দুই পালিত মা তাঁকে ইংরেজদের কাছে ধরিয়ে দিতে পারেন। সেই আশংকাও ছিল যুগলকিশোরের মনে। আর, ইংরেজরা জানতে পারলে কখনই সিরাজ পুত্রকে বাঁচিয়ে রাখতো না। সেই কারণে শ্রীহট্ট জেলায় গিয়ে আত্মগোপন করেন যুগলকিশোর।

ফরিদপুর জেলার যাপুর গ্রামের ভট্টাচার্য পরিবারের রুদ্রাণী দেবীকে বিয়ে করেছিলেন যুগলকিশোর রায়চৌধুরী। তাঁর গর্ভেই হরকিশোর এবং শিবকিশোর নামের দুই পুত্রের জন্ম হয়। একইসঙ্গে জন্ম নেয় আরও চার কন্যা। অন্নদা, বরদা, মোক্ষদা এবং মুক্তিদা। পুত্র শিবকিশোর অল্প বয়সেই মারা যান।

শিবকিশোরের আয়ুও খুব বেশি ছিল না। শিব কিশোর রাজশাহী জেলার বৃকুৎসা গ্রামের কাশীনাথ মজুমদারের মেয়ে ভাগীরথী দেবীকে বিয়ে করেন। তাঁর গর্ভে কৃষ্ণমণি নামে এক কন্যার জন্ম হয়। কৃষ্ণমণির অল্প বয়সেই মৃত্যু হয় পিতা শিবকিশোরের।

আরও পড়ুন- সেনাপতি মোহনলালের বোন মাধবীর গর্ভে জন্মেছিল সিরাজের পুত্র

রুদ্রাণী দেবীর দুই পুত্র সন্তানের মৃত্যু ঘটলে যুগলকিশোর ফের বিয়ে করেন। দ্বিতীয় স্ত্রী যমুনার গর্ভে জন্ম নেয় পুত্র প্রাণকৃষ্ণনাথ রায়চৌধুরী। শেষ জীবনে এই পুত্র সন্তানকে নিজের জন্মের ইতিবৃত্ত বলে গিয়েছিলেন যুগলকিশোর। একইসঙ্গে অবগত করেছিলেন ইংরেজদের থেকে এই নিজেদের প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখতে। ১৮১১-১২ সালের মধ্যে মৃত্যু হয় যুগলকিশোরের। পিতার ইচ্ছে অনুসারে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে যুগলকিশোরকে সমাধিস্থ করেন প্রাণকৃষ্ণনাথ রায়চৌধুরী।

মুর্শদাবাদের খোশবাগে নবাবের সমাধি ক্ষেত্রের মসজিদ

এরপরে প্রাণকৃষ্ণনাথ রায়চৌধুরীর মাধ্যমে এগিয়ে যেতে থাকে সিরাজ উদ দৌলার বংশ। প্রাণকৃষ্ণনাথ রায়চৌধুরীর প্রথম পুত্র কাজল ১২ বছর বয়সে মারা যায়। দ্বিতীয় পুত্র শৌরীন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পরেন। এই বিষয়টি জানতে অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়েছিলেন প্রাণকৃষ্ণনাথ।

পুত্র শৌরীন্দ্রকিশোরকে নিজেদের পারিবারিক পরিচয় সম্পর্ক অবগত করে এই সকল বিশয় থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন তিনি। পিতার পরামর্শে এবং ইংরেজদের থেকে বাঁচতে নাম বদল নড়ে লেখাপড়ায় মন দেন। শৌরীন্দ্রকিশোর নাম বদল করে প্রথমে প্রসন্ন চন্দ্র রায়চৌধুরী এবং পরে প্রসন্ন কুমার দে বলে পরিচিত হন। স্কলারশিপ পেয়ে ১৮৪৮ সালে হিন্দু কলেজে ভরতি হয়েছিলেন। সেই সময়েই হিন্দু কলেজ প্রেসিডেন্সি কলেজে রূপান্তরিত হয়।

প্রসন্ন কুমার দে ওরফে প্রসন্ন চন্দ্র চৌধুরী ওরফে শৌরীন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী তিনটি বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রী ত্রিপুরেশ্বরী দেবীর গর্ভে একটি, দ্বিতীয় স্ত্রী মোহিনীর গর্ভে দু’টি এবং তৃতীয় স্ত্রী হিরন্ময়ীর গর্ভে ছয় পুত্র ও এক কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। প্রথম স্ত্রী ত্রিপুরেশ্বরী দেবীর গর্ভে জন্ম নেওয়া প্রসন্ন কুমার দের সন্তানের নাম হল উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী।

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী বাংলা সাহিত্য জগতের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি নাম। সাহিত্যিক সুকুমার রায়ের পিতা এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ঠাকুরদা ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। যদিও নবাব সিরাজ উদ দৌলার বংশধরদের সঙ্গে বাংলার বিখ্যাত রায় পরিবারের কোনও যোগাযোগ নেই।

সাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ১৮৬৩ সালের ১২ই মে ময়মনসিংহ জেলার মসূয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কালীনাথ রায় ছিলেন সুদর্শন ও আরবি, ফার্সি ও সংস্কৃতে সুপণ্ডিত। তাঁর ডাকনাম ছিল শ্যামসুন্দর মুন্সী। উপেন্দ্রকিশোর শ্যামসুন্দরের আটটি সন্তানের মধ্যে তৃতীয় পুত্রসন্তান। তাঁর পৈতৃক নাম ছিল কামদারঞ্জন রায়। পাঁচ বছরেরও কম বয়সে তাঁর পিতার অপুত্রক আত্মীয় জমিদার হরকিশোর রায়চৌধুরী তাঁকে দত্তক নেন ও নতুন নাম দেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী।

দু’জনেই উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। প্রথমজন নবাব সিরাজের বংশধর। অপরজন সাহিত্যিক

তথ্য সূত্র: অমলেন্দু দে রচিত সিরাজের পুত্র ও বংশধরদের সন্ধানে

Advertisement ---
---
-----