নৌ-বিদ্রোহে কংগ্রেসের ‘বেইমানি’ নাটকে তুলে ধরেছিলেন উৎপল দত্ত

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: নৌ-বিদ্রোহ দমনে বৃটিশদের পাশে দাঁড়িয়ে কংগ্রেস বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল৷ আর এই কথাই উৎপল দত্ত তুলে ধরেছিলেন কল্লোল নাটকে৷ তবে সরকার বিরোধী এমন বার্তা দিতে গিয়ে ষাটের দশকে জেলেও যেতে হয় এই নাট্যকার-নির্দেশক-অভিনেতাকে৷ তারপর অবশ্য তাঁর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়েছিল জনসমাজ৷

১৯৬৫ সালের ২৮ মার্চ মিনার্ভা থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয়েছিল উৎপল দত্ত রচিত ও নির্দেশিত কল্লোল নাটক ৷ এই নাটকের প্রেরণা ছিল বৃটিশ আমলে নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া শাহদাৎ আলির লেখা ‘নৌ-বিদ্রোহ’ বইটি৷ লালবাজারে পুলিশের কেন্দ্রীয় সংগ্রহশালার থেকে গোপনে তা উৎপল দত্তের হাতে পৌঁছেছিল বলে জানা যায়৷ এই নাটক প্রসঙ্গে খোদ উৎপল দত্ত বলেছিলেন, ‘‘ কল্লোল নাটক স্বাধীনতা সংগ্রামে নাবিক ও মজদুরদের শুধু বীরত্ব গাথাই শুধু বলেনি, বলেছিল কংগ্রেসি বেইমানদের দেশদ্রোহিতার কথা৷’’

১৯৪৬ সালে নৌ-বিদ্রোহের সময় কংগ্রেসের বল্লভভাই প্যাটেল এবং মুসলিম লিগের মহম্মদ আলি জিন্না উভয়ই তখন নৌ-সেনাদের বিনা শর্তে আত্মসমর্পণের কথা বলেছিলেন৷ তাছাড়া কার্যত তাদের ষড়যন্ত্রেই নৌবিপ্লবীদের কারাগারে পাঠান হয়েছিল বলে একটা মতবাদ রয়েছে৷ উৎপল দত্তও ওই নাটকের মাধ্যমে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন অস্ত্র ছাড়া জয় অসম্ভব তাই অহিংসা সত্যাগ্রহের পিছনে লুকিয়ে রয়েছে সাম্রাজ্যবাদের দালালি ৷

- Advertisement -

বরং কমিউনিস্টরা দেশপ্রেমিক এবং অতীতেও তারা ইংরেজের বিরুদ্ধে লড়েছে সেটাই মানুষের কাছে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন তিনি৷ তবে সেই সময়ই কল্লোল নাটকে নৌ-বিদ্রোহের পরিণতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যের সত্যাসত্য নিয়ে অবশ্য বির্তক দানা বেঁধেছিল৷

কেন্দ্রে এবং রাজ্যে সর্বত্রই তখন কংগ্রেস সরকার৷ ফলে কল্লোল নাটকের বিষয়বস্তু যে ভাল লাগবে না তা বলাই বাহুল্য৷ নানাভাবে এই নাটক প্রদর্শনী আটকাতে চাপ তৈরি করা হচ্ছিল৷ দেখা গিয়েছিল বাজারি সংবাদপত্রগুলি কেউ কল্লোল নাটকের বিজ্ঞাপন ছাপতে রাজি ছিল না৷ তবু মানুষের মুখে মুখেই চলতে থাকা প্রচারের জেরে মিনার্ভায় নাটক দেখতে ভিড় জমে৷ সংবাদপত্রের আচরণে ক্ষুব্ধ হতে থাকেন শিল্প সংস্কৃতি জগতের ব্যক্তিত্বরাও৷ আনন্দবাজার, যুগান্তর সহ বিভিন্ন কাগজ কল্লোল নাটকের বিজ্ঞাপন না ছাপার জন্য এ রাজ্যে সংবাদপত্রগুলির কাছে যৌথ ভাবে প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছিলেন, সত্যজিৎ রায়, মধু বসু ,মন্মথ রায় সহ একদল শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী৷

এরপর ১৯৬৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মহালয়ার দিন ‘ভারতরক্ষা আইনে’ গ্রেফতার করা হয় উৎপল দত্তকে৷ কিন্তু শুধু বাংলা নয়, দুনিয়া জুড়েই কল্লোল নাটকের সমর্থনে এবং উৎপল দত্তের মুক্তির দাবিতে সাংস্কৃতিক জগৎ সোচ্চার হতে থাকে৷ সোভিয়েত কবি দোলমাতোভস্কি, মার্কিন আণ্ডারগ্রাউন্ড থিয়েটারের জোসেফ সেলবি, জার্মান নাট্যকার ফনকুবা এবং পরিচালক হান্স পের্টেন-র পাশাপাশি অবজার্ভার, টাইম গার্ডিয়ান পত্রিকায় এই বিষয়ে সমালোচনা হয়৷

পাশাপাশি দেশের মধ্যে সত্যজিৎ রায়, মধু বসু ,মন্মথ রায়কে সামনে রেখে প্রতিবাদে নামেন এখানকার শিল্প সংস্কৃতি জগতের মানুষেরা৷ তাঁদের নেতৃত্বে ১৯৬৬ সালের ২৩ মার্চ উৎপলের মু্ক্তির দাবিতে রাজপথে এক মহামিছিল হয়েছিল৷

তখন এমনিতেই সময়টা খাদ্য আন্দোলনে জর্জরিত রাজ্য৷ কিন্তু উৎপলের মুক্তির দাবির মিছিলকে সতর্ক করতে তৎকালীন রাজ্য সরকার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল তা আটকাতে গুলি চালান হবে৷ কিন্তু মিছিলের দিন খোদ সত্যজিৎ রায়কে একেবারে সামনে থাকতে দেখে পুলিশ আর সেই সাহস দেখায়নি৷

এর পরেই সাত মাস জেলের অন্তরালে থাকার পর অবশেষে মুক্তি পান উৎপল দত্ত ৷ তাঁর এই মুক্তিকে সামনে রেখে ৭মে ময়দানে বামপন্থীরা ‘কল্লোল বিজয় উৎসব’-এর ডাক দেয়৷ ওই দিন একেবারে খাইবার জাহাজের ডেকের আদলে তৈরি হয়েছিল সভামঞ্চ আর প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষের জমায়েত হয়েছিল সেখানে৷

Advertisement ---
---
-----