প্রসেনজিৎ চৌধুরী: বিজয় দিবস-উপমহাদেশ তো বটেই দুনিয়ার রণাঙ্গনের খতিয়ানে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়৷ একটি রাষ্ট্রের জন্ম মুহূর্ত এই দিনটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে৷ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশ তৈরি হয়েছিল৷ টানা সংগ্রামের পর পূর্ব পাকিস্তানিরা পেয়েছিলেন নিজেদের দেশ৷ এই সংগ্রামে জড়িয়ে ভারত৷ ইন্দিরা গান্ধীর কূটনৈতিক চালে, পাল্টা আক্রমণে শেষ হয়ে গিয়েছিল পাক সেনা৷

বিজয় দিবস প্রতিবছরই পালিত হয় দুই রাষ্ট্রে৷এই মুক্তিসংগ্রামে বাংলাদেশিরা যেমন অংশ নিয়েছিলেন৷ তেমনই পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরার বাসিন্দারাও ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন৷ যার যা কিছু রয়েছে সেটাই ছিল অস্ত্র৷ ওপার বাংলাকে স্বাধীন করতে হবে এই ছিল তাঁদের স্বপ্ন৷তবে মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সেনার যৌথ অভিযানে সেই সব অচর্চিত কাহিনী হারিয়ে গিয়েছে৷

এখানেই চমক-মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে লড়াই করেছিলেন এমন সব পশ্চিমবঙ্গবাসী যাদের অনেকেই আর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসেননি৷ লড়াইটা চলছিল পূর্ব বাংলার ধান জমি, আলপথ, বাঁশঝাড়, পুকুর পাড় আর রাজপথে৷
সেই সময় বালুরঘাটের বাসিন্দা বিশ্বনাথ লাহা তাঁর অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন www.kolkata24x7.com-কে তিনি জানিয়েছেন- বালুরঘাট সংলগ্ন বিভিন্ন গ্রাম থেকে অনেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই চালিয়েছিলেন৷ সাক্ষাৎকারে বিশ্বনাথবাবু জানিয়েছেন, এরকম মুক্তি যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন, এমন একজনকে বিশেষ করে মনে পড়ে৷ সে হিলি থানার বিনশিরা অঞ্চলের রমেশচন্দ্র লাহার জ্যেষ্ঠপুত্র খোকন লাহা৷বছর চল্লিশ আগে অসুস্থতার কারণে তার মৃত্যু হয়৷

এরকমই অনেকের কথা হারিয়ে গিয়েছে৷ খোকন লাহার মতো অনেক ভারতীয় মুক্তিযোদ্ধা সেদিন পূর্ব বাংলার রক্তস্নাত মাটিতে প্রবল লড়াই করেছিলেন৷ পরে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে তারা ফিরে আসেন নিজেদের বাড়িতে৷

পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তিসংগ্রাম শুরুর আহ্বান জানিয়ে শেখ মুজিবের বজ্রগম্ভীর আহ্বান ছিল-যার যা কিছু রয়েছে তা নিয়েই পাক সেনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার৷ সেটাই ছড়িয়ে পড়ে দুই বাংলার ঘরে ঘরে৷ ফলে দেশ ভাগের পর যারা নিজেদের ভিটে-মাটি ছেড়ে এসেছিলেন তারও আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন৷ আর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হতেই তাতে অনেকে অংশ নেন৷

১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় অন্যতম কেন্দ্র ছিল তৎকালীন পশ্চিম দিনাজপুর জেলার সদর শহর বালুরঘাট ( এখন দক্ষিণ দিনাজপুরের সদর)৷ বিখ্যাত হিলি সীমান্ত থেকে ওপারের বগুড়া ও নাটোরের সংঘর্ষ তৈরি করেছিল অভূতপূর্ব ঘটনা৷ হিলির যুদ্ধ (Battle of Hilli) তারই অন্যতম৷

বিশ্বনাথ লাহা বলেন, হিলি থেকে ভারতীয় সেনার অভিযান চলাকালীন ট্যাংক ও বিভিন্ন সমরাস্ত্র অকেজো হয়ে যেত৷ সীমান্তের খুব কাছে গিয়ে সেই সব অস্ত্র সারিয়ে দেওয়ার কাজটি করতে হত আমাকে৷ তখন বালুরঘাটে এসব সারানোর কোনও ব্যবস্থা ছিল না৷ আর অকেজো অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে গেলে তার পরিণতি পরাজয়ের সামিল৷ দিনের পর দিন সেই কাজ করেছি৷ এতে অংশ নিয়েছিলেন বালুরঘাট সংলগ্ন গ্রামের কয়েকজন যুবক৷ যারা আক্ষরিক অর্থেই ভারতবাসী-মুক্তিযোদ্ধা৷

হিলি যুদ্ধ কেন অভিনব: ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান আত্মসমর্পণ করার পরেও হিলি সংলগ্ন ওপার বাংলার বগুড়ায় চলেছিল যুদ্ধ৷ এই ঘটনা বিরলতম বলেই ধরা হয় বিশ্ব রণাঙ্গনের ইতিহাসে৷ তৎকালীন স্থানীয় পাক সেনা কমান্ডার তাজাম্মুল হুসেইন মালিক কিছুতেই আত্মসমর্পণ করতে চাননি৷ ফলে এই এলাকায় ভারতীয় সেনা কমান্ডার লছমন সিং লাহেল ও মুক্তিবাহিনীর অফিসার কাজী নূরুজ্জামান যৌথভাবে প্রতি আক্রমণ চালিয়ে গিয়েছিলেন৷

সাক্ষাৎকারে বিশ্বনাথবাবু বলেন, যেভাবে পাক সেনার শেলিং শুরু হয়েছিল তাতে বালুরঘাটবাসীদের জীবন বিপন্ন করেই কাটাতে হয়েছে৷ প্রায় পুরো শহরটাই জনবিরল হয়ে গিয়েছিল৷ নিরাপদ দূরত্বে পরিবার রেখে রেখে আমি সরাসরি ভারতীয় সেনার বিভিন্ন সমরাস্ত্র মেরামত করতে থাকি৷ নিজের লেদ কারখানা থাকায় সেখানেই ছিল সেনা অফিসার ও তাদের অনেকেরই আসা যাওয়া৷ একের পর এক অস্ত্র সারিয়েছি নিজের হাতে৷ সেসব নিয়েই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেনাবাহিনী৷

তখন ওপারের পরিস্থিতি:
বিভিন্ন নথিপত্র থেকে জানা গিয়েছে, বগুড়া ও হিলি সংলগ্ন এলাকার পাক সেনা কমান্ডিং অফিসার তাজাম্মুল হুসেইন মালিক প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন৷ তার সামরিক দক্ষতায় চমকে যান ভারতীয় সেনা অফিসাররা৷ হিলির যুদ্ধে বেগ পেতে হচ্ছিল ভারতীয় সেনা ও মুক্তিবাহিনীকে৷ অবশেষে সব প্রতিরোধ চূর্ণ করে বগুড়া দখল করা হয়৷ লছমন সিং লাহেল ও অন্যান্য অফিসারদের নেতৃত্বে বগুড়ার কাছ ১৮ ডিসেম্বরে আত্মসমর্পণ করে পাক সেনা৷ এর দুদিন আগেই সম্পন্ন হয়েছিল ঢাকায় পাক সেনার সারেন্ডার পর্ব৷

বিশ্বনাথবাবু বলেছেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বেশ কয়েকবার সেদেশে গিয়েছি৷ আন্তরিক শুভেচ্ছা আপ্লুত হয়েছি৷ বগুড়াবাসী যেভাবে ভারতীয়দের আত্মত্যাগের কথা স্বীকার করেন তাতে চমকে যাই৷ অবাক লাগে যখন দেখি মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর হয়ে ভারতীয়-বাঙালিদের অংশ নেওয়ার বিষয়টি প্রায় অচর্চিত থেকে যায়৷

একাত্তরের যুদ্ধের পর বালুরঘাট শহরেই রাখা হয়েছে সেই যুদ্ধে ব্যবহৃত ট্যাংক৷ স্থানীয়রা একে ট্যাংক মোড় বলেই জানেন৷ বালুরঘাটবাসীর তরফ থেকে ঐতিহাসিক হিলির যুদ্ধের অন্যতম নায়ক লছমন সিং লাহেলকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে৷ বয়স জনিত কারণে ব্রিগেডিয়ার লাহেল এখন অসুস্থ৷ তিনি প্রায়ই রোমন্থন করেন সেই স্মৃতি৷ তাঁর রোমন্থনেও অনেকবার উঠে এসেছে সেই সব ভারতীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কথা৷যেমনটা জড়িয়ে রয়েছে খোকন লাহার মতো অনেকের সঙ্গে৷