“What a fall”, বুদ্ধর কথা শুনে ফেলেছিলেন ক্ষিতি

একটা সময় ছিল, যখন রাজ্যের বামফ্রন্টের নেতারা উত্তর থেকে দক্ষিণ, কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ চষে বেড়াতেন৷ ব্যস্ততার মধ্যেই দিন-রাত কাটত৷ কিন্তু রাজ্যপাট হাতছাড়া হতেই তাদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে৷ কেউবা নিজেকে আড়াল করে নিয়েছেন৷ কেউ করেছেন দলবদল৷ কিন্তু কিছু কমরেড এখন ঠিক কী করছেন? কী করে তাঁদের দিন কাটছে৷ সেই সব নিয়ে Kolkata24x7 এ বিশেষ ধারাবাহিক প্রতিবেদন #কেমন_আছেন_কমরেড?

দেবময় ঘোষ, কলকাতা: “What a fall”- বলেছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য৷ বামফ্রন্টের মন্ত্রিসভা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে তাঁর পদত্যাগপত্র মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে জমা দিয়ে ফিরে আসার সময় বুদ্ধবাবুর সগতোক্তি শুনে কিছুটা থমকে দাঁড়িয়েছিলেন পূর্তমন্ত্রী ক্ষিতি গোস্বামী৷ তবে ঘুরে দাঁড়াননি৷ রাইটার্সের কাঠের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমেই একটা ট্যাক্সি ধরলেন৷ দ্বাররক্ষী, নিরাপত্তাকর্মী, কলকাতা পুলিশের অফিসাররা বিস্মিত৷ মন্ত্রী যাবেন ট্যাক্সিতে…? তারা বিশ্বাসই করতে পারছেন না৷ রাইটার্স থেকে ট্যাক্সি ধরে সোজা আরএসপির রাজ্য দপ্তরে পৌঁছলেন ক্ষিতি৷ রাজ্য সম্পাদক দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে সব জানানোর পর তিনি বললেন, ‘‘দাঁড়ান, দেখছি৷ মিটিং তো একটা ডাকতে হবে৷’’

২০০৭ সালের ১৪ মার্চ নন্দীগ্রামের ঘটনার দিনই মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন ক্ষিতি৷ কারণ সেই ঘটনা তাঁর পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না৷ বুদ্ধবাবুর সেই সগতোক্তি – “What a fall” বা ‘‘কী বিচ্যুতি!’’ এখনও তাঁর কানে বাজে৷ ‘‘রাজনীতিতে আমি ওর থেকে সিনিয়র৷ মন্ত্রিসভা থেকে আমার পদত্যাগ ওর কাছে বিচ্যুতি মনে হয়েছিল৷ তবে কথাটা আমার কানে গিয়েছিল..’’ বললেন প্রাক্তন পূর্তমন্ত্রী৷

কথা বলতে বলতে একবার থামলেন কমরেড ক্ষিতি গোস্বামী, তারপর বলতে লাগলেন, ‘‘মন্ত্রিত্ব ছাড়বার পর সরকারি গাড়ি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করিনি৷ যেমন মেনে নিতে পারিনি সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে সরকারের পদক্ষেপ৷ আমার রাজ্য সম্পাদক দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় আমাকে জ্যোতিবাবুর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন৷ ইতিমধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ইন্দিরা ভবনে ডেকে সিঙ্গুরের ব্যাপারে বুঝিয়েছেন জ্যোতিবাবু৷ মমতা রাজিও হয়েছিলেন৷ কিন্তু এরা (পড়ুন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও নিরুপম সেন) রাজি হননি৷’’

জ্যোতি বসু আপনাকে কী বলেছিলেন? ‘‘উনি আমার রাজনীতির আইকন৷ বাম মন্ত্রিসভা গঠিত হবার অনেক আগেই ওকে আমি চিনতাম৷ একসঙ্গে আন্দোলন করেছি৷ সেদিন আমার হাত ধরে তিনি বলেছিলেন, বামফ্রন্ট সহজে তৈরি হয়নি৷ কত মানুষ জীবন দিয়েছেন৷ কত মানুষ জেল খেটেছেন৷ তারপর বামফ্রন্ট তৈরি হয়েছে৷ তোমার মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার অর্থ হল বাম ঐক্যে ফাটল ধরা৷ তুমি ফিরে যাও৷ ফ্রন্ট ভেঙো না৷ জ্যোতিবাবুর ওই অনুরোধ আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল৷ তবুও আমি ওকে বলেছিলাম, আমার পার্টি সিদ্ধান্ত নিক৷’’ বললেন ক্ষিতি৷

মন্ত্রিসভায় ফিরে এসেছিলেন ক্ষিতি৷ তবে ক্ষমতার শীর্ষে যে সিপিএমের যে মন্ত্রীরা ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে মতপার্থক্যে ইতি পড়েনি৷ অকপট ক্ষিতি জানান, ‘‘কাজের ফিরিস্তি নিয়ে বুদ্ধবাবু বা অসীমবাবুর কাছে হাজির হতাম৷ অর্থের সংস্থান নিয়ে দড়ি টানাটানির খেলা চলছিল৷ মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আমার মতপার্থক্য ছিল৷ আমি ওকে বোঝাতে চেয়েছিলাম, কেউ আপনাকে ‘Misguide’ করছে৷ ‘Bureaucracy’ আপনাকে ভুল বোঝাচ্ছে৷ বহু ফসলি জমি না নেওয়াই বামফ্রন্টের নীতি৷ জমির ব্যাপারে চাষিদের জোর করতে গেলে ফল মারাত্মক হতে পারে৷ উনি (বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য) বলেছিলেন, কয়েকজন কী বলছে, তার জন্য প্রকল্প বন্ধ থাকবে? সরকার জমি নেবেই৷ প্রকল্প থেকে পিছিয়ে আসার প্রশ্ন নেই৷’’

সত্তরোর্ধ ক্ষিতি ‘পূর্তমন্ত্রী ক্ষিতি গোস্বামী’ হিসেবে মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন৷ এক সময়কার ঢাকুরিয়ার বিধায়ক মন্ত্রিত্ব পেয়েছিলেন হঠাতই৷ জ্যোতিবাবুর মন্ত্রীসভায় তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ৷ ‘‘যতীন চক্রবর্তী ও জ্যোতি বসু হরিহর আত্মা ছিলেন৷ পরবর্তীকালে দফতর নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিবাদ বাধে৷ কিন্তু আরএসপি যতীনবাবুকে পদত্যাগ করতে বলেছিল৷ এরপর মোহিত রায় যতীন চক্রবর্তীর জায়গায় পূর্তমন্ত্রী হয়েছিলেন৷ তবে ১৯৯৫ সালে তাঁর মৃত্যুর পর দল আমাকে পূর্ত মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব দেয়৷ আগেই বলেছি, জ্যোতিবাবু আমার রাজনৈতিক আইকন৷ ওকে আমি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলাম,’’ পুরানো কথা মনে করলেন ক্ষিতি গোস্বামী৷

বালুরঘাট কলেজের ছাত্র ক্ষিতি জীবনযুদ্ধে কখনও হেরে যাননি৷ বালুরঘাট থেকে অবিভক্ত দিনাজপুরের জেলা সদর রায়গঞ্জে আনতে চেয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়৷ প্রতিবাদে মুখর বালুরঘাটবাসীর আন্দোলনে যোগ দিলেন তিনিও৷ সেই আন্দোলনের পুরোভাগে ছিল আরএসপি৷ আন্দোলনের জীবন শুরু হল ক্ষিতির৷ দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অনেক কিছুই দেখেছেন তিনি৷ যা দেখেছেন তার অনেক কিছুই এখন আর মেলাতে পারেন না৷ ‘‘এক সময় সিপিএম বনাম নকশালদের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মাঝেই কংগ্রেসের মদতে তৈরি হল একটি গোষ্ঠী৷ ওদের কাজ ছিল,পাড়ায় পাড়ায় বামপন্থীদের খুঁজে বের করে খুন করা৷ বাইরে নিজেদের ওরা দেখাতো নকশাল৷ ভিতরে ওরা কিন্তু আসলে কংগ্রেসী৷ আমরা নাম দিলাম ‘কংসাল’৷ ‘ফাটা কেষ্ট’ নামে কংগ্রেসের এক নেতা ছিল একজন কংসাল৷ ওর রাজনৈতিক গুরু ছিলেন সোমেন মিত্র৷’’ স্মৃতিচারণ করলেন ক্ষিতি৷

‘‘বাহাত্তর সালে নির্বাচন হয়েছিল৷ রিগিং শব্দটি উৎপত্তি হল ওই নির্বাচনের পর৷ সিদ্ধার্থশংকর রায় মুখ্যমন্ত্রী হলেন৷ বরানগর থেকে ৯৬ হাজার ভোটে পরাজিত হলেন জ্যোতিবাবু৷ আবার সাতাত্তর সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর বাংলায় জনজাগরণ শুরু হল৷ সারা দেশ থেকেই হারতে লাগল কংগ্রেস৷ ১৯৮০ সালে ময়দানে কংগ্রেস-বিরোধী সভার মূল লক্ষ্য ছিল দেশের ক্ষমতা থেকে কংগ্রেসকে দূরে রাখা৷ ওই মঞ্চেই অটলবিহারী বাজপেয়ীর সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়েছিলেন জ্যোতিবাবু৷’’ বলে চললেন ক্ষিতি৷

তবে ফুটবল থেকে কখনই দূরে থাকতে পারেননি ক্ষিতি৷ খেলা পাগল ক্ষিতির হৃদয়ে রয়েছে কলকাতা ময়দান৷ ‘‘এই পরশুই ইস্টবেঙ্গলের ফাউন্ডেশন ডে-এর অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম৷ ক্রীড়ামন্ত্রী অরুপ বিশ্বাস চেয়ারটা ছেড়ে দিয়ে সৌজন্যতা দেখালেন৷ ভালো লাগে, এখনও মানুষ সম্মান করে৷ ইস্টবেঙ্গলের যে তাঁবু বানিয়েছিলাম, সারা ভারতের অন্য কোনও ফুটবল ক্লাবের নেই৷ মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাবের গ্যালারি ভেঙে গিয়েছিল৷ তৈরি করে দিয়েছি৷ সুলতান (সুলতান আহমেদ) আসত আমার কাছে৷ মোহনবাগানেরও লাইটস্ট্যান্ড বানিয়েছিলাম৷ পরে অবশ্য ওই স্ট্যান্ডে আলো নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছিল৷ লিয়েন্ডারের বাবা ভেস পেজও আসতো আমার কাছে৷ পি কে ব্যানার্জি, চুনী গোস্বামীরাও আমার বন্ধু৷ টেনিস, বেসবল, রাগবি, কবাডি প্রায় সব খেলার সঙ্গেই আমি যুক্ত ছিলাম৷’ তবে আমাকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেছিল মন্ত্রিসভায় আমার বন্ধু সুভাষ চক্রবর্তী৷’’

বাম সরকার ফিরবে, আশা করেন না বর্ষীয়ান কমরেড, আরএসপির রাজ্য সম্পাদক, ক্ষিতি গোস্বামী৷ তিনি মনে করেন, ‘‘কঠিন প্রশ্ন৷ যেভাবে গণতন্ত্রকে খুন করা হল পঞ্চায়েত ভোটে, তারপর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে৷ তবে ভোটের রাজনীতি নয়, গণআন্দোলনের মাধ্যমেই টিকে থাকবে বামপন্থা৷’’