সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : ১৩ তারিখ শুরু হতে চলেছে গঙ্গাসাগর মেলা। পৌষ সংক্রান্তির সময় প্রত্যেক বছর এই মেলা বসে। সময় এগিয়েছে, গঙ্গার জলে দূষণ বেড়েছে, সাগরের মেলাও এখন আরও সুন্দর। সবমিলিয়ে বহু পরিবর্তন এসেছে কিন্তু মানুষের পুন্য লাভের ইচ্ছায় যেমন কোনও ত্রুটি পড়েনি তেমনই গঙ্গাসাগর মেলাকে ঘিরে বহু প্রচলিত প্রবাদেরও কোনও পরিবর্তন হয়নি।

‘সব তীর্থ বারবার , গঙ্গাসাগর একবার’। এখন সাগরে যাওয়ার পথ এতটাই সহজ যে অনেকেই প্রত্যেক বছরই এখন পুণ্য সারতে মুনির আশ্রমে গিয়ে হাজির হন। তবু গঙ্গাসাগরে একবারই যাওয়া যায়। বারবার সেখানে যাওয়া যায় না। গঙ্গাসাগর যেমন একটি তীর্থস্থান তেমন অমরনাথ যাত্রাও এক তীর্থ স্থান। গঙ্গাসাগরে যাওয়া এখন অনেক সহজ, তুলনায় অনেক কঠিন অমরনাথ যাত্রা। এখনও বহু মানুষ আছেন যারা অমরনাথের দর্শন না পেয়েই ফিরে আসেন। কখনও প্রকৃতি বাধা হয়ে দাঁড়ায় কখনওবা কঠিন যাত্রায় শরীর দেয় না। জঙ্গী হানাও এখন এই তীর্থ যাত্রার অন্যতম সমস্যার কারণ।

তবু গঙ্গাসাগর একবারই। পুণ্য অর্জন করতে একসময় বহু তীর্থ পরিক্রমা করতে বহু মাস সময় লেগে যেত। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তির সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত চোর ডাকাতের ভয়,রোগভোগ। পুণ্য অর্জন করতে গিয়ে অনেকেরই জীবন চলে যেত। তবুও পুণ্য লাভের আশা কমেনি। কোনও ভাবে বেঁচে ফিরলে অনেক তীর্থ ক্ষেত্রেই মানুষ দ্বিতীয়বার যেত। অন্তত চেষ্টা থাকত। কিন্তু কোনও তীর্থ প্রসঙ্গেই বলা হয়নি এই তীর্থে একবারই যাওয়া সম্ভব। এক এবং অদ্বিতীয় গঙ্গাসাগর।

এই প্রবাদের উৎপত্তি কিভাবে? কবে থেকে এই প্রবাদ চালু হল তা বলা মুশকিল কিন্তু সবকিছুর পিছনেই কোনও কারণ থাকে। এই প্রবাদের পিছনেও যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তবে একটি নয় দুটি কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। ১) একসময় গঙ্গাসাগরের পথ ছিল যেমন দুর্গম,তেমনি বিপদসংকুল। পদে পদে কাঁটা। সাগরে নৌকাডুবিতেও বহু মানুষের মৃত্যু হত। নদী ছাড়লেও, ছাড়ত না জলসদ্যুরা। পুণ্যের লক্ষ্যে আসা মানুষদের জন্যই তারা ওত পেটে বসে থাকত। পথেই হামলা। সবকিছু লুঠ করে উধাও। মেরে ফেলত যাত্রীদেরও। পুন্যের ঝুলি শূন্য। সঙ্গে জলের সমস্যা বড় সমস্যা।

সাগরদ্বীপ, চারিদিকে জল থই থই। কিন্তু খাবার জল? তা পাওয়া যায় না। সংগ্রহে রাখা জল শেষ হলেই সমস্যার শুরু। নৌকা আশ্রমের পৌঁছতে পৌঁছতে শরীর খারাপ হয়ে যেত মানুষের। সঙ্গে সাগরের প্রবল ঠান্ডা হাওয়া। খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো। নিউমোনিয়া থেকে শুরু করে ডি-হাইড্রেশন হওয়ার জন্য আদর্শ পরিবেশ। তীর্থে পৌঁছেও অনেকে রোগে আক্রান্ত মানুষ মারা যেত। ফলে ঘরে ফেরার আশা না নিয়েই গেলেও অনেকের ঘরে ফেরা হত না। পাশাপাশি একবার যে ঘরে ফিরে আসত , দ্বিতীয়বার সে সাগরে যাবার নামটি নিত না।

২) সবার উপরে বিশ্বাস। প্রথম কারণ যদি পাঠকের যুক্তিযুক্ত মনে হয় তাহলে দ্বিতীয় কারণ দাঁড়িয়ে মানুষের বিশ্বাসের উপর। ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহু দূর’। সেই বিশ্বাসকেই অনেকে মনে করছেন এটাই ‘গঙ্গাসাগর একবার’ প্রবাদের আসল কারণ। পুন্যার্থীদের বিশ্বাস ,গঙ্গাসাগর তীর্থে যে একটিবার স্নান করবে সে জীবনের সমস্ত পাপ মুক্ত হয়ে যাবে। লাভ হবে পরম মোক্ষ। সাগরের জলে ডুব দিলে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঠাণ্ডা কাঁপিয়ে দেবে। আর সেটাই হবে মোক্ষ লাভ।

এমনটি মোক্ষ ভূ-ভারতে আর কোথাও নেই বলেই বিশ্বাস। আর মোক্ষ লাভ একবারই হয়। বারবার মোক্ষ লাভ হয় না। আর এই মোক্ষ লাভের যুক্তিই অধিকাংশের বদ্ধমূল বিশ্বাস যে এই কারণেই গঙ্গাসাগর একবারই আসা সম্ভব। সেখানে জলসদ্যু ঠাণ্ডা কেউ ধারেকাছে আসে না। পুরাণ এই যুক্তিকে আরও একটু এগিয়ে খাড়া করেছে। পুরাণ মতে প্রয়াগে মৃত্যু হলে মোক্ষ লাভ হয়, বেনারসের গঙ্গায় যাওয়ার পথে জলে ,স্থলে মৃত্যু হলে মোক্ষ লাভ হয়, কিন্তু গঙ্গাসাগরে জলে,স্থলে,অন্তরীক্ষেও যদি মৃত্যু হয় তাহলে মেলে মহামুক্তি। অর্থাৎ মোক্ষ লাভ অন্য তীর্থেও হতে পারে কিন্তু মহামুক্তির সন্ধানে এখানেই আসতে হয়।

পুরাণ অনুযায়ী, এই মহামুক্তির পিছনেও যুক্তি রয়েছে। কেমন সেই যুক্তি? বলা হচ্ছে, এখানেই ছিল মহাঋষি কপিলের আশ্রম। এখানেই মুনির ক্রোধে পরে সগররাজের ৬০ হাজার সন্তানের বহু বছর নরক যন্ত্রণার পরে তাদের শাপমুক্তি ঘটেছিল। যে দিন এই পরমমুক্তি ঘটেছিল তা ছিল পবিত্র মকরসংক্রান্তির দিন। সেই একই কথা মেনে লক্ষ লক্ষ মানুষ এখানে আসেন মহা মুক্তি এবং মোক্ষ লাভের আশায়।