কি শাস্তি হবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ?

মানব গুহ, কলকাতা: ২০১৬ র ৮ই নভেম্বর, ভারতের ইতিহাসে এক বিরলতম দিন৷ ওই রাতেই জাতির উদ্দেশ্যে এক ঘোষণায় সমস্ত ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল করে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী৷ ভারতবাসী জানল, শুরু হয়ে গেছে Demonetisation বা নোটবন্দী৷ বাংলায় নোটবাতিল৷ তারপর, গোটা দেশটাই দাঁড়িয়ে পড়ল ব্যাংকের সামনে লম্বা লাইনে৷ সমস্ত কালো টাকা নাকি ধরা পড়ে যাবে৷ আবেগ ভরা কন্ঠে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দাবী করেছিলেন, এই ‘মিশন’ ব্যর্থ হলে, যে কোন শাস্তি তিনি মাথা পেতে নেবেন৷ রিজার্ভ ব্যাংকের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, পুরোপুরি ব্যর্থ মোদীর নোটবন্দী৷ এবার কি শাস্তি হবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর?

প্রশ্ন উঠছে৷ উঠছে অনেক প্রশ্ন৷ কি শাস্তি হবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর? ৮ই নভেম্বর নোটবাতিলের পর, ১৩ নভেম্বর গোয়াতে নিজের মুখে প্রকাশ্যে সংবাদমাধ্যমের সামনে জাতির উদ্দ্যেশ্যে জানিয়েছিলেন, নোটবাতিল ব্যর্থ হলে যে কোন শাস্তি তিনি মাথা পেতে নেবেন৷ রিজার্ভ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী পুরোপুরি ব্যর্থ এই নোটবন্দীর খেলা৷ কি জানাচ্ছে রিজার্ভ ব্যাংক? দেখে নি দেশের রিজার্ভ ব্যাংকের সেই রিপোর্ট৷

৮ই নভেম্বর ২০১৬, নোটবাতিলের ঠিক আগে দেশে ১০০০ টাকার পরিমাণ ছিল ৬৮৫৮ লক্ষ কোটি টাকা৷ নোটবাতিলের পর ৩১শে মার্চ, ২০১৭ তে রিজার্ভ ব্যাংকে ১০০০ টাকার নোটে জমা পড়েছে ৬৮৪৯ লক্ষ কোটি টাকা৷ প্রায় ৯৮.৭০ শতাংশ ১০০০ টাকার নোট ফিরে এসেছে রিজার্ভ ব্যাংকের কাছে৷ মাত্র ৮৯২৫ কোটি টাকা আর বাইরে পড়ে আছে, যা মূল টাকার মাত্র ১.৩০ শতাংশ৷ অর্থাৎ পুরোন সমস্ত ১০০০ টাকার নোট জমা পরে গেছে রিজার্ভ ব্যাংকে৷ এই রিপোর্ট অন্য কারোর নয়, স্বয়ং ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের তৈরি৷

- Advertisement -

৮ই নভেম্বর ২০১৬, নোটবাতিলের সময় দেশে ৫০০ ও ১০০০ টাকা নিয়ে মোট টাকার পরিমাণ ছিল ১৫.৪৪ লাখ কোটি টাকা৷ যার মধ্যে ৪৪ শতাংশ ছিল ১০০০ টাকার নোটে৷ বাকি ৫৬ শতাংশ ছিল ৫০০ টাকার নোটে৷ পুরনো ৫০০ টাকার হিসাবটাও প্রায় একই রকম৷ তবে, নতুন ৫০০ টাকার নোট বাজারে চলে আসায় ৫০০ টাকার হিসাবটা এখনও স্পষ্ট নয় রিজার্ভ ব্যাংকের কাছে৷ তবুও রিজার্ভ ব্যাংক সূত্রে যেটা জানা যাচ্ছে যে, ৫০০ টাকার ক্ষেত্রেও হিসাবটা প্রায় একইরকম৷ ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশ পুরোন ৫০০ টাকার নোট জমা পরে গেছে রিজার্ভ ব্যাংকে৷

তাহলে হিসাবটা কি দাঁড়াল? এটা কোনও বিরোধী রাজনৈতিক দলের দেওয়া হিসাব নয়৷ কোন অভিযোগও নয়৷ এটা ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের রিপোর্ট৷ অর্থাৎ, খোদ সরকারের রিপোর্ট৷ পুরোন ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশ জমা পরে গেছে রিজার্ভ ব্যাংকে৷ মোদীর কালো টাকার তত্ত্ব সম্পূর্ণ খারিজ করে প্রায় সমস্ত পুরোন টাকা জমা পড়ে গেল সরকারের ঘরে৷ গেল কোথায় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা মত সেই কোটি কোটি কালো টাকা? উঠছে প্রশ্ন৷

এবার প্রশ্ন উঠছে৷ কে নেবে এই চরম বালখিল্যতার দায়িত্ব৷ সাধারন মানুষের নাজেহাল অবস্থার দায়িত্ব৷ গোটা দেশ জুড়ে নোটবন্দীর পর মারা গেছেন অনেক মানুষ৷ ব্যাংকের লাইনেও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে৷ ব্যবসায় মন্দা এসেছে৷ পুরো দায়টা নরেন্দ্র মোদী কেন নেবেন না? প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরা৷ প্রশ্ন তুলেছেন নোটবাতিলের পর ভুক্তভোগী সাধারন মানুষ৷

আরও বড় প্রশ্ন উঠে আসছে৷ তবে কি, এতদিনের জমে থাকা কালো টাকা সাদা করে দিতেই মোদীর এই নোটবন্দীর খেলা? নোটবাতিলের ফায়দা তুলে সব কালো টাকাই কি তবে সাদা হয়ে গেল? দেশের সব কালো টাকা কোথায় গেল? কি করে সাদা হয়ে গেল সমস্ত কালো টাকা? প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীরা৷ প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ মানুষ৷

অন্যদিকে নোটবন্দীর জালে জড়িয়ে ভারতের GDP রেট কিন্তু উল্লেখযোগ্য হারে কমছে৷ ২০১৭ র প্রথম কোয়ার্টারে দেশের GDP হার দাঁড়িয়েছে ৬.১৷ অর্থনীতিবিদ দেবনারায়ণ সরকার পরিষ্কার জানাচ্ছেন, ‘নোটবাতিল পুরোপুরি ব্যর্থ, সমস্ত বাতিল টাকাই জমা পরে গেছে সরকারের ঘরে৷ এদিকে নোটবাতিলের জেরেই কমে গেছে ভারতের GDP রেট৷ তার জন্যও দায় নিতে হবে বিজেপি সরকারকেই৷’ এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়, ২০১৬ র প্রথম ত্রৈমাসিকে এই GDP র হার ছিল প্রায় ৯.২, কিন্তু নোটবাতিলের জেরে ২০১৭ র প্রথম ত্রৈমাসিকে GDP র হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬.১৷ এবং এই হার বেশ কমের দিকে৷

প্রশ্ন উঠছে, নোটবাতিলের জেরে এই ভয়ংকর অবস্থার দায়িত্ব কে নেবে? মানুষের মৃত্যু, নাজেহাল অবস্থা, চরম হয়রানি, সাধারণ জীবন যাত্রা সম্পূর্ণ ব্যহত হবার পর এবার দেশের চরম ক্ষতি৷ কে দায়িত্ব নেবে? প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীরা৷ প্রশ্ন উঠছে সাধারন মানুষের মনে৷

যদিও বিজেপির তরফ থেকে বলা হয়েছে, কোটি কোটি টাকার জাল নোট বাতিল হয়ে ভারতীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হয়েছে৷ কিন্তু সেটাও যে কথার কথা তাও প্রায় প্রমাণিত৷ কত জাল নোট বাতিল হয়েছে তার কোন প্রমাণ এখনও পাওয়া যায় নি৷ বিজেপির এই বক্তব্যও উড়িয়ে দিয়েছেন বিরোধীরা৷

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর গালভরা ‘নোটবন্দী’ বা নোটবাতিল মুখ থুবড়ে পড়েছে, রিজার্ভ ব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী৷ কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, সেই নোটবাতিলের ফল এখনও ভোগ করতে হচ্ছে গোটা দেশকে৷ মোদীজি নিজেই দাবী করেছিলেন, নোটবাতিল ব্যর্থ হলে যে কোন শাস্তি মাথা পেতে নেবেন৷ এমনিতেই নোটবাতিলের জেরে মানুষের হয়রানি, মৃত্যু, ব্যবসায় সংকট, দেশের GDP হার কমার দায়িত্ব নিতেই হবে প্রধানমন্ত্রীকে৷ তারপর, তাঁর ঘোষণা অনুযায়ীও তাঁকে শাস্তি পেতে হবে৷ কি শাস্তি হবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর?

Advertisement
---