ত্রাণ হিসেবে সেবার কেরলকে মহাত্মা দিয়েছিলেন ৬০০০ টাকা

বিশেষ প্রতিবেদন: সালটা ১৯২৪, সেই বছরেও ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছিলেন কেরলবাসী৷ পরাধীন ভারতে এটি অন্যতম বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়৷ সেই সময় কেরলের ভয়াবহতা বুঝে সর্বস্ব উজাড় করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী৷ বিপুল ত্রাণ সামগ্রীর পাশাপাশি সেদিন ৬ হাজারের বেশি টাকা দিয়েছিলেন মহাত্মা৷ চুরানব্বই বছর আগে সেই টাকার মূল্য আজকের সময়ে কত হতে পারে তা নিয়ে পাটিগণিতের হিসেব চলবে৷ কিন্তু মহাত্মার অবদানটি প্রায় ধুলো চাপা পড়ে গিয়েছিল৷ সম্প্রতি কেরলের বন্যায় ত্রাণ বাবদ দেশি-বিদেশি অর্থ দানের যে বিতর্ক চলছে তাতে এই ইতিহাস চমকপ্রদ এবং শিক্ষনীয়৷

১৯২৪ সালের সেই বন্যায় যখন কেরল ভাসছিল তখনই সংবাদ পেয়ে পথে নেমেছিলেন গান্ধী৷ ঘুরে ঘুরে সেই সময়ে প্রায় ৬,৯৯৪ ১৩ আনা ৩ পয়সা সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন৷ এই বিপুল অর্থে কেরলকে পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়েছিল৷

গান্ধীজীর বার্তা ছিল স্পষ্ট- ‘ভাসমান কেরলকে বাঁচাতে হাত খুলে দান করা হোক৷ দেশের প্রত্যেকটি কোনা থেকে আসুক উন্মুক্ত দান৷ যাদের ঘর নেই, খিদে পেটে দিন কাটছে তাদের বাঁচান৷ যতটা পারা যায় দান করুন’৷ ১৯২৪ সালের ১৭ অগস্ট ‘নবজীবন’নামক প্রবন্ধে গান্ধীজী এই আবেদন করেন৷ ১৯২৪ সালের সেই বন্যায় প্রাণ হারিয়েছিলেন অন্তত ২৯০ জন, গৃহহীন হন ১০ লক্ষ মানুষ৷ ত্রাণ শিবিরের অভাবে মাথার ছাদ ও খাদ্যের হাহাকার গ্রাস করে কেরলকে৷ সেই সময়ই ‘নবজীবন’প্রবন্ধে দফায় দফায় গান্ধীজীর লেখা ছাপা হয়৷ প্রতিবারেই বন্যার ভয়াবহতাকে প্রাধান্য দিয়ে দেশবাসীকে পাশে থাকার বার্তা দিয়েছিলেন তিনি৷ গান্ধীজীর বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে সেদিন মন থেকে গোটা ভারতবাসীকে পাশে পায় কেরল৷

কিন্তু কীভাবে?

পুরনো নথিতে ধরা রয়েছে এই তথ্য৷ তাতে দেখা যাচ্ছে- খাদ্য সংকট ঠেকাতে দেশের বেশিরভাগ মানুষ তখন নিজেদের এক বেলার খাবার কেরলের বন্যার্ত মানুষগুলোর জন্য উৎসর্গ করেছিলেন৷ গৃহপালিত গরুর দুধ বিক্রি করে সেই টাকা অনুদান খাতে দেওয়া হয়৷ মহিলারা নিজেদের গয়না অনুদান খাতে দিতে দ্বিধা করেননি৷ ‘নবজীবনে’ই ত্রাণ সংগ্রহ শেষ হওয়ার পর মহাত্মা লিখলেন-‘ আমার এক বোন তাঁর ৪টি সোনার চুড়ি অনুদান খাতে দিয়েছেন, আরও একটি বোন সোনার সরু হার ও বড় হার দিয়েছেন, এক ছোট্ট বোন তার পায়ের দুটি রূপোর নূপুর দিয়েছে, আর এক বোনও পায়ের সোনার আংটি আমার হাতে দিয়েছেন, সবমিলিয়ে ৬,৯৯৪ ১৩ আনা ৩ পয়সা সহ ত্রাণ পাঠাচ্ছি’

কেরলের জাতীয় কংগ্রেস কার্যালয়ে দফায় দফায় আসত মহাত্মা গান্ধীর টেলিগ্রাম৷ সেখানেই অনুদান সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য দিতেন তিনি৷ কেরলের ১৯২৪ সালের বন্যা ‘৯৯ মহা প্রলয়ম’নামেও কুখ্যাত৷ ইংরাজির ১৯২৪ সালের নিরিখে মালায়ালাম ক্যালেন্ডারের বছরটি ছিল ১০৯৯ সাল৷ আর সেই কারণেই ‘৯৯ মহাপ্রলয়ম’ নামকরণ করা হয়েছে৷ সেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেরলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত৷ ২০১৮ সালর বন্যা সেই ভয়ঙ্কর অধ্যায়েরই পুনরাবৃত্তি বলে মনে করা হচ্ছে৷ এই দুর্যোগে ৩৫০ জনের মৃত্যু, গৃহহীন ৬-৭ লক্ষ মানুষ , ৪-৫ হাজার ত্রাণ শিবির- এই নিয়েই হল সাম্প্রতিক কেরলের সার্বিক চিত্র৷

বন্যা বিধ্বস্ত কেরল এখনও বিপুল অনুদানের অপেক্ষায়৷ পার্থক্য শুধু সংগ্রহে ও মানসিকতায়৷

Advertisement
---
-----