লোকসভা ভোটের আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় বাজিমাৎ কোন দলের?

স্টাফ রিপোর্টার, কলকাতা: ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী সরকার কেন্দ্রে আসার পেছনে সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন৷ এটা মানেন রাজ্যের বিরোধী দলগুলির অনেক নেতা-ই৷ তাই ২০১৯ লোকসভা ভোটের আগে সোশ্যাল মিডিয়া প্রচারে জোর দিচ্ছে সব দলই৷

রাজনীতির গতিপথ অন্যদিকে ঘুরেছে। স্মার্টফোন আর Application এ ব্যস্ত মানুষ ফেসবুক, টুইটারে অনেক বেশি সময় কাটায়। ভার্চুয়াল দুনিয়া অনেক কাছে টানে আম জনতাকে। একই সঙ্গে গুরুত্ব কমেছে পড়ার মোড়ের পলিটিক্যাল আড্ডার। রাজনীতি নিয়ে বাঙালির চায়ের লড়াই চলে ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপ গুলোতে৷ মোদী থেকে মমতা , সাধারণ মানুষের সঙ্গে সর্বক্ষণ যোগযোগ রাখতে সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর অনেকটাই নির্ভর করে থাকেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে রাহুল গান্ধী, নরেন্দ্র মোদী থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, টুইটারে বা ফেসবুকে কয়েক কোটি মানুষ এদের Follow করেন। ভোটের আগে সোশ্যাল মিডিয়াতে সাধারণ মানুষের মনোভাবেরও একটা আঁচ পাওয়া যায় বলে মনে করেছেন রাজ্যের বিভিন্ন দলের মিডিয়া প্রধানরা৷

সিপিএমের সোশ্যাল মিডিয়া সেল:

অনেকদিন থেকেই রাজ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা বলে আসছে বামেরা৷ রাজনীতির ময়দানে সেই অর্থে এখনও ঘুরে দাঁড়াতে না পারলেও সোশ্যাল মিডিয়াতে আস্তে আস্তে অনেকটাই জায়গা করে নিয়েছে সিপিএম৷ রাজ্যে মিডিয়া সেলের দায়িত্ব প্রাপ্ত অমিয় প্রাপ্ত বলেন, ‘‘আগে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া সেল এতটা স্ট্রং ছিল না৷ কিন্তু সিঙ্গুর থেকে নবান্ন কৃষক মিছিলের প্রচার সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে করে আমরা সাফল্য পেয়েছি৷’’ কী ভাবে কাজ করে সিপিএম-এর সোশ্যাল মিডিয়া সেল?

অমিয়বাবু বলেন, ‘‘রাজ্যের প্রতিটি জেলায় আমারা সোশ্যাল মিডিয়া সেল তৈরি করা শুরু করেছি৷ এবং প্রতিটি জেলার সোশ্যাল মিডিয়া সেলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল৷ প্রতিটি জেলার নিউজ তার জেলা সোশ্যাল মিডিয়া সেল পাঠাবে আমাদের রাজ্য মিডিয়া সেলে৷ এখান থেকে সেগুলো মানুষের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হবে সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে৷’’

কংগ্রেসের সোস্যাল মিডিয়া অস্ত্র:

সোশ্যাল মিডিয়া সেলকে চাঙ্গা করতে রীতিমতো সফটওয়ার কোম্পানির মালিককে মিডিয়া সেলের মাথায় বসিয়েছে কংগ্রেস৷ প্রদেশ কংগ্রেসের সোশ্যাল মিডিয়া প্রধান মিতা চক্রবর্তী রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের প্রাক্তনী৷ পড়াশোনা করেছেন কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে৷

তিনি জানান, রাজ্যের সোশ্যাল মিডিয়া সেলে তিনি ছাড়াও আরও তিনজন রয়েছেন৷ পাশাপাশি রাজ্য জুড়ে রয়েছেন প্রায় ১০০ সোশ্যাল মিডিয়া কনভেনার৷ তবে তাঁরা ২৯৪টা বিধাসভাতেই একজন করে মিডিয়া কনভেনার বসাতে চান৷ সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচার দেশের নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলে? মিতা জানা, ‘‘অনেকটাই প্রভাব ফেলে৷ কারণ আজ প্রান্তিক মানুষের হাতেও স্মার্টফোন পৌঁছে গেছে৷ তবে রাজ্যে সোশ্যাল মিডিয়ার মেইন মাধ্যম ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ৷ অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে টুইটারের ব্যবহার কম৷’’

কীভাবে কাজ করে কংগ্রেসের সোশ্যাল মিডিয়া সেল? মিতা জানান, দলের মধ্যে অনেকেই কন্টেট লেখেন৷ কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ এবং সম্প্রীতির যে আদর্শ এবং রাহুল গান্ধির বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক চিন্তাভাবনা আমরা তাঁরা সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে৷ প্রয়োজন মতো বিভিন্ন কন্টেটের সঙ্গে হিউমার মিশিয়ে সেগুলিকে আরও মনোগ্রাহী করার চেষ্টা করা হয়৷ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় যে সোশ্যাল মিডিয়া কনভেনার রয়েছেন তারা আঞ্চলিক ইস্যুগুলিকে তাদের জেলা পেজের মাধ্যমে সামনে আনেন৷ প্রয়োজন মতো সেই ইস্যুগুলিকেও রাজ্যস্তরে প্রোমোট করা হয়৷

তৃণমূলের ডিজিটাল কনক্লেভ:

মাঠের লড়াইয়ে মোদীকে হারানোর লক্ষ্যে সোশ্যাল মিডিয়া প্রচারে শান দিচ্ছে রাজ্যের শাষক দল৷ সেই লক্ষ্যেই সম্প্রতি ডিজিটাল কনক্লেভের আয়োজন করেছিল তৃণমূল৷ ১০ সেপ্টেম্বর নজরুল মঞ্চের সেই অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়৷ লোকসভা ভোটকে মাথায় রেখে তৈরি হয়েছে তৃণমূলের ডিজিটাল টিম। অবশ্য বিজেপির ঘর ভাঙিয়ে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া সেল সাজিয়েছে তৃণমূল৷

রাজ্যের শাসক দলের সোশ্যাল মিডিয়া সেলের দারিত্বে রয়েছেন প্রাক্তন বিজেপি নেতা দীপ্তাংশ চৌধুরী৷ যিনি এক সময় বিজেপির আইটি সেলের দায়িত্বে ছিলেন। ডিজিটাল মিডিয়া সম্পর্কে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে রাজ্যের প্রতিটি জেলায় বৈঠক করেছে তৃণমূল। কয়েকহাজার টেকস্যাভি স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়েকে নিয়ে তৈরি হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া টিম৷ যাদের কাজ হল লোকসভা ভোটের আগে সোশ্যাল মিডিয়াতে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে প্রচার৷

বিজেপির সোশ্যাল মিডিয়া যুদ্ধ:

সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে যে নির্বাচনের ফলাফলের পার্থক্য ঘটানো সম্ভব সেটি বাকি দলগুলিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে৷ সোশ্যাল মিডিয়া সেলেকে রীতিমতো ইন্ড্রাস্টিতে পরিণত করেছে বিজেপি৷ রাজ্য বিজেপির সোশ্যাল মিডিয়া সেলের দুটি আলাদা সেক্টর রয়েছে, আইটি এবং মিডিয়া সেল৷ সোশ্যাল মিডিয়াতে বিজেপির আধিপত্যের কথা অন্যান্য দলের নেতার আড়ালে আবডালে স্বীকার করে থাকেন৷ রাজ্য বিজেপির মিডিয়া প্রধান সপ্তর্ষী চৌধুরী জানান, রাজ্যে বিজেপির ৩৮ সাংগঠনিক জেলার ৩৭টিতে কাজ করছে সোশ্যাল মিডিয়া সেল৷

প্রতি বিধানসভায় একজন কনভেনার এবং দুজন কো কনভেনার, একই ভাবে প্রতি লোকসভায় একজন কনভেনার এবং দু’জন কো কনভেনার পাশাপাশি জেলা স্তরে একজন মিডিয়া সেলের আধিকারিক এবং তার সহকারি৷ ঠিক এইভাবেই সুনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে কাজ করে বিজেপি মিডিয়া সেল৷ রাজ্যের যে কোনও প্রান্তে ছোট একটা ঘটনা ঘটলেও সেটা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চলে আসে রাজ্যের মিডিয়া সেলের হাতে৷ আইটি এবং মিডিয়া সেল নিয়মিত যোগাযোগ রেখে কাজ করে বিজেপিতে৷ কোন খবর কোন সময় এবং কিসের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে তারও নির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি হয় রোজ৷

---- -----