কুপওয়ারার ঘটনার পিছনে কারা?

নিখিলেশ রায়চৌধুরী: জম্মু-কাশ্মীরের কুপওয়ারায় যে জঙ্গিদের সঙ্গে যৌথবাহিনীর গুলির লড়াই হল তাদের দলে সাতজন ছিল বলে জানা গিয়েছে৷ এদের মধ্যে পাঁচজন জঙ্গি নিহত হয়েছে বলে খবর৷ বাকি দুজন গেল কোথায়? পাঠানকোটে জঙ্গি হামলার সময়েও ঠিক কজন আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদী সেখানে ঢুকেছিল তা শেষ পর্যন্ত জানা যায়নি৷

সেনা অপারেশন সফল হওয়ার পরেও ধন্দ রয়ে গিয়েছিল৷ কুপওয়ারাতেও নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের পর দেখা গেল, দুজন জঙ্গি বেপাত্তা৷ আশার কথা, সেনা কমান্ডোরা কুম্বিং অপারেশন চালাচ্ছেন৷ কিন্তু এর মধ্যে ওই দুই জঙ্গি যদি প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে অধিকৃত কাশ্মীরে ফিরতে সমর্থ হয়, তাহলে ভারতের সেনাবাহিনীর নাগাল এড়িয়ে আবারও উপত্যকায় আইএসআই এজেন্টরা জিতে যাবে৷

ভারতের মাটিতে আইএসআই এজেন্টদের পাকড়াও করার ক্ষেত্রে একটা বড় অসুবিধা হল, আচার-আচরণ, জীবনযাত্রা, এমনকী ভাষাতেও ভারতবাসীর সঙ্গে পাকিস্তানি গুপ্তচরদের আলাদা করা যায় না৷ মুসলিম জনসংখ্যার নিরিখে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র ভারত৷ সুতরাং, এদেশে যদি কেউ উর্দুতেও কথা বলে এবং সে যদি পাকিস্তান থেকে এসে ভারতে বসবাস করতে আরম্ভ করে, বিশেষ করে মুসলিম মহল্লায়, তাহলে সেখানে কী করে বোঝা যাবে যে–কে পাকিস্তানি গুপ্তচর, আর কে নয়? এছাড়া আবার বহু হিন্দু ভারতীয়ও প্রলোভনের বশে আইএসআইয়ের হয়ে গুপ্তচরের কাজ করে৷ জেনে কিংবা না-জেনে৷

- Advertisement -

মুসলিম মহল্লায় বাস করেন এমন উর্দুভাষী মুসলিম ভারতীয় নাগরিকরাও অনেক সময় বিপদে পড়ে যান আইএসআই এজেন্টদের চিনতে না-পেরে৷ অনেকে আবার সতর্ক হতে চাইলেও হতে পারেন না৷ কারণ, প্রভাবশালী মহল থেকে তাঁদের ‘কওম’ রক্ষা করতে বলা হয়৷

কাশ্মীর উপত্যকায় বিপদ আরও বেশি৷ কারণ, দশকের পর দশক ধরে সেখানে পাকিস্তানি অনুপ্রবেশকারীরা ঢুকেছে৷ সামান্য ছুতোনাতায় তারা সেখানে হিংসা ছড়ায়৷ ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ডঃ মনমোহন সিং প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর আইন শিথিল করে আস্থা বাড়ানোর কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন৷ কিন্তু তাতেও কোনও লাভ হয়নি৷ পাক সামরিক গুপ্তচর বাহিনীর প্ররোচনায় বরং সেই পদক্ষেপ বানচাল হয়ে গিয়েছে৷ জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি বলেছেন, সন্ত্রাসবাদীরা আত্মসমর্পণ করলে মাথাপিছু ৬ লক্ষ টাকা দেওয়া হবে৷ সেই আহ্বানে যদি আদতে কোনও লাভ হত, তাহলে কুপওয়ারার মতো ঘটনা ঘটত না৷

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকে একটা ব্যাপার বরাবরই দেখা গিয়েছে৷ যখনই ভারতের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ার রাস্তা নেওয়া হয়েছে তখনই সীমান্তের ওপার থেকে এমন একটা উত্তেজনার পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে যার পর শান্তির পথে এগনোর কোনও উপায়ই আর থাকেনি৷

কুপওয়ারার ঘটনায় আবারও প্রমাণ হল, জম্মু-কাশ্মীরে মেহবুবা মুফতির সরকারই থাকুক আর ন্যাশনাল কনফারেন্সের সরকারই আসুক, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার ওপার থেকে সন্ত্রাসবাদীদের এপারে পাঠানোর ক্ষেত্রে আইএসআই কখনই গা-ঢিলে দেবে না৷ ভারতকে তারা কখনই শান্তিতে থাকতে দেবে না৷ কারণ, দীর্ঘমেয়াদি ছায়াযুদ্ধে ভারতের রক্তক্ষয় করার উপরেই তাদের অস্তিত্ব নির্ভর করছে৷ আপাতত তারা আফগানিস্তানের দিকে তাদের নজর সরিয়েছে৷ কারণ, আফগানিস্তানের তালিবানি গোষ্ঠীগুলির অনেকেরই টার্গেটে রয়েছে পাকিস্তান৷ কিন্তু ভারতের বিরুদ্ধে আইএসআই ছায়াযুদ্ধ চালিয়েই যাবে৷ জেনারেল জিয়া উল-হকের ‘অপারেশন টোপাজ’ এখনও শেষ হয়নি৷

আমাদের ভারতবাসীর মুশকিল এটাই, লোকদেখানো ভদ্রতায় আমরা সহজেই ভুলে যাই৷ যাঁরা পাকিস্তানে গিয়েছেন তাঁরা ফিরে এসে বলেছেন, সেখানকার আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়৷ দুঃখের বিষয়, সেই মুগ্ধতা কাটার আগেই সীমান্ত প্রহরায় মোতায়েন কোনও না কোনও ভারতীয় সেনা কিংবা সেনা অফিসারের মাথা পাকিস্তানে রেঞ্জার্সের বকলমে আইএসআইয়ের ঘাতকেরা ঢুকে কেটে নিয়ে চলে যায়৷

আমরা ভারতবাসী এও ভুলে যাই যে, বহু দিন ধরেই পাকিস্তান রাষ্ট্রটাকে চালাচ্ছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী৷ বিশেষ করে, সেদেশেই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রাষ্ট্র বলে পরিচিত ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স অর্থাৎ আইএসআই৷ এই ক্ষমতাটা আইএসআই অর্জন করেছে ১৯৮০-র দশকে৷ কট্টর ভারত-বিরোধিতা ছাড়া আইএসআইয়ের অস্তিত্বের আর কোনও উপযোগিতা নেই৷

কুপওয়ারায় সেনা, আধা-সামরিক ও পুলিশ যৌথ অভিযানে পাঁচ সন্ত্রাসবাদী যেমন খতম হয়েছে ঠিক তেমনই দুই সেনা জওয়ান সহ পাঁচ নিরাপত্তাকর্মীও নিহত হয়েছেন৷ দুজন সন্ত্রাসবাদীর এখনও কোনও খবর নেই৷ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে আসা পাক অনুপ্রবেশকারীদের ঠিকানা সাধারণত হয় কাশ্মীর উপত্যকা, না হলে দিল্লির লাগোয়া উত্তরপ্রদেশ কিংবা পশ্চিমবঙ্গ৷ আগে যারা বাংলাদেশ সীমান্ত পার হয়ে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ চালানোর উদ্দেশ্যে এদেশে ঢুকত তারা ট্রানজিট পয়েন্ট হিসাবে পশ্চিমবঙ্গের মাটিকে ব্যবহার করে তার পর অন্যান্য রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ত৷ তখন আইএসআইয়ের অপারেশনাল হেডকোয়ার্টার্স ছিল ঢাকায়৷ এখন অবশ্য ব্যবস্থাটা ঠিক কী রকম হয়েছে, সেটা ভারতের গোয়েন্দা বাহিনীই ভালো বলতে পারবে৷

কিছু দিন আগে ভারতের জেনারেল বিপিন রাওয়াত ঠিকই বলেছেন৷ ভারতকে ঘিরে একটা ব্যূহ তৈরি করা হচ্ছে৷ দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ভারতের বিরুদ্ধে লাগাতার চলছে৷ গত বছরেই ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের দিক থেকে অন্তত ৮৮২ বার প্রাণঘাতী সীমান্ত লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে৷ এ বছরেও সেই প্রবণতায় কমতি নেই৷ কুপওয়ারার ঘটনা থেকেই তা প্রমাণিত৷

Advertisement ---
---
-----