মানব গুহ, কলকাতা: উগ্র হিন্দুত্বের নামে এক নারকীয়, পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড দেখল গোটা ভারতবর্ষ৷ বিজেপি শাসিত রাজ্য রাজস্থানে ‘লাভ জেহাদ’ এর অভিযোগের নামে নারকীয় তাণ্ডব সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখে স্তম্ভিত সাধারণ মানুষ৷ ইতিমধ্যেই প্রতিবাদে উত্তাল গোটা দেশ৷ তবে, এই ধরনের ঘটনা নতুন নয়৷ অন্য ধর্মের মেয়েকে ভালোবেসে প্রেমের বলি হয়েছেন বাংলার যুবকরাও৷

মালদহের কালিয়াচকের বাসিন্দা শ্রমিক মহম্মদ আসরাফুল খান (বয়স ৪৬) তিন মাস আগে কাজ করতে যান রাজস্থানে৷ বাড়িতে তাঁর স্ত্রী ও তিনটি মেয়ে আছে, যাঁরা বিড়ি বাঁধার কাজ করেন৷ ‘লাভ জেহাদ’ এর অজুহাতে তাঁকে প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে একের পর এক কোপ মেরে জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হয়৷ শুধু তাই নয়, কেউ বাঁচাতে আসেন নি তাঁকে৷ তার চেয়েও ভয়ংকর ঘটনা হল, সেই হত্যাকাণ্ডর ভিডিও মোবাইলে তুলে তা ছেড়ে দেওয়া হয় সোশ্যাল মিডিয়াতে৷

Advertisement

আরও পড়ুন: লাভ জিহাদের অভিযোগে মালদার শ্রমিককে পুড়িয়ে খুন

বারবার প্রাণ ভিক্ষার আর্তিতেও মেলেনি রেহাই, ‘বাবু জান বাঁচাও…..বাবু জান বাঁচাও’- এভাবে বারবার আকুতি মিনতি করেছে আসরাফুল আর দুস্কৃতি বারবার কোপ দিয়ে গেছে৷ শেষে গায়ে কেরোসিন ঢেলে দিয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় জ্যান্ত মানুষটিকে, কিছুক্ষণ পর প্রাণ হারায় সে৷ ভিডিও দেখে শিউরে উঠেছে গোটা দেশ৷

এই ঘটনা মোবাইলে আপলোড করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে হুঁশিয়ারিও দেয় হত্যাকারী। মুহূর্তের মধ্যে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়৷ দুস্কৃতি শম্ভুলাল রেগরকে গ্রেফতার করা হয়েছে৷ চারদিকে নিন্দার ঝড় উঠেছে। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ট্যুইটারে লিখেছেন – ‘রাজস্থানে বাংলার শ্রমিককে নৃশংসভাবে হত্যার নিন্দা করছি, কী করে মানুষ এমন অমানবিক হয়? দুঃখজনক ঘটনা’৷

আরও পড়ুন: লাভ জিহাদ মামলার হাদিয়ার স্বামীর সঙ্গে ছিল IS যোগ: NIA

রাজস্থানের নৃশংস ঘটনা কিছু দুঃখজনক প্রশ্ন আবার তুলে দিয়েছে৷ যে প্রশ্নগুলোর কোন উত্তর পাওয়া যায়নি৷

শুধু বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতেই নয়, গত কয়েকবছরে ভিন জাতে প্রেম ও বিয়ের বিরুদ্ধে মানুষ খুনের ঘটনা ঘটেছে এই বাংলাতেও৷ দুটি ঘটনা এখনও মানুষের চোখের সামনে ভাসে৷ তবে তখন কোনও সরকারকে বা লাভ জেহাদকে টেনে আনা হয়নি৷

বনগাঁর দীপঙ্কর রায় ও বাদুরিয়ার নিতাই দাস৷ এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, মুসলিম মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করার৷ আর শুধুমাত্র সেই অপরাধেই দুজনকেই নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়েছিল ঠিক মহম্মদ আসরাফুল খানের মতোই৷ শুধু তফাৎ ছিল ধর্মে৷ উপরের দুজন ছিল হিন্দু আর নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে মহম্মদ আসরাফুল খান ছিলেন মুসলমান৷

আরও পড়ুন: লাভ জিহাদের বদলায় মুসলিম মহিলাকে হিন্দু পরিবারে বিয়ে দেবে এই সংগঠন

উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বাদুড়িয়া থানার অন্তর্গত শিবপুর গ্রামের ‘মুসলিম’ হাবিবুর বিশ্বাসের মেয়ে সাইনা বিশ্বাসের অন্তরঙ্গতা হয়েছিল পাশের চন্ডীপুর গ্রামের ‘হিন্দু’ নিতাই দাসের সঙ্গে৷ নিতাই দাসের পরিবারের তরফে সম্পর্কে আপত্তি না থাকলেও, আপত্তি ছিল হাবিবুরের পরিবারের। দুইজনেই প্রাপ্তবয়স্ক ছিল৷ তাই স্বাভাবিক নিয়মে, বিয়েতে কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা ছিল না৷ কিন্তু অভিযোগ, হাবিবুর বিশ্বাস তার মেয়েকে কোনও ‘কাফেরের’ হাতে তুলে দিতে রাজি ছিলেন না। তাই সাইনার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখলে নিতাইকে যে চরম মূল্য দিতে হবে সেই হুমকিও দেয় বলে অভিযোগ।

অতএব, পরিবারের আপত্তি এড়াতে সাইনা ২৫শে আগস্ট, ২০১৫ নিতাই-এর সঙ্গে পালিয়ে যায়। তারা বনগাঁতে নিতাই দাসের এক আত্মীয়র বাড়িতে এক রাত থাকে। এরপরেই হাবিবুরের পরিবারের পক্ষ থেকে সাইনাকে ফোন করে বলা হয় যে মেয়ের বিরহে তারা যারপরনাই ব্যথিত, তাই তারা যেন বাড়ি ফিরে আসে। সাইনার সাথে নিতাই-র বিয়েতে হাবিবুরের যে আর আপত্তি নেই সেই মর্মেও আশ্বস্ত করা হয় তাদেরকে।

হতভাগ্য নিতাই এই চাল বুঝতে পারেনি, তাই সে সাইনাকে নিয়ে গ্রামে ফিরে আসে। কিন্তু, সাইনাকে তার বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়ে সে আর কোনদিনই নিজের বাড়ি ফিরতে পারেনি। নিতাই-র সাথে তার বাড়ির লোকের শেষ কথা হয়েছিল ২৭শে আগস্ট, ২০১৫৷ তারপর থেকেই সে উধাও হয়ে যায়৷ থানাতে জানিয়েও কোনও লাভ হয়নি। অবশেষে, ৩০শে আগস্ট, ২০১৫ তারিখে জঙ্গলের ভিতর থেকে উদ্ধার হল নিতাই দাসের লাশ।

আরও পড়ুন: ‘লাভ জিহাদের’ ফাঁদ কাটতে মেলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা যায় তার চোখ উপড়ে নেয়া হয়েছে, অণ্ডকোষ ফাটিয়ে দেয়া হয়েছে, ধারাল অস্ত্র দিয়ে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে গায়ের চামড়া। অমানুষিক শারীরিক অত্যাচারের চিহ্ন তার সর্বাঙ্গে। অভিযোগ, তারপরেও পোস্টমর্টেম রিপোর্টে লেখা হয়- “No wound found”।

প্রশ্ন উঠছে এটাই যে, এই নৃশংসতা নিয়ে কটা ট্যুইট হয়েছিল? নিতাই দাসের হত্যাকাণ্ড নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কতগুলো পোস্ট পড়েছিল? কতজন সাধারণ মানুষ এর প্রতিবাদ করেছিলেন? কতজন রাজনৈতিক নেতা এর বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিলেন? প্রশ্ন কিন্তু উঠছে৷

বনগাঁর দীপঙ্কর রায়ের হত্যাকাণ্ডও অনেকটা এই ধরনেরই ছিল বলেই অভিযোগ৷ একটি মুসলিম মেয়েকে ভালোবাসাই তার একমাত্র অপরাধ ছিল বলেই জানা যায়৷ ২০১২ সালের ৩ রা ডিসেম্বর নির্মম ভাবে খুন করা হয় দীপঙ্করকে (বয়স ২২)৷ অভিযোগ ওঠে আমির আলি নামে একজনের বিরুদ্ধে৷

জানা যায়, সেলিমা বলে একজন মুসলিম মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করে দীপঙ্কর৷ একদিন মোটরবাইকে বাড়ি ফেরার পথে কিছু মুসলিম সংগঠনের সদস্যরা তাকে পিটিয়ে গুলি করে হত্যা করে বলে অভিযোগ ওঠে৷ অভিযোগ ওঠে মুসলিম সংগঠনের প্রধান আমির আলির বিরুদ্ধে৷

আরও পড়ুন: ফের প্রকাশ্যে লাভ জিহাদ? প্রাক্তন মডেলকে জোর করে ধর্মান্তকরণের চেষ্টা

তখনও অভিযোগ ওঠে, ঠিকমতো পোস্টমর্টেম না করেই পুলিশি পাহাড়ায় তড়িঘড়ি দাহ করে দেওয়া হয় মৃতদেহ৷ রাজস্থান নয়, ঘটনা তৃণমূল শাসিত বাংলায়৷ প্রশ্ন উঠছে এটাই যে, এই নৃশংসতা নিয়ে কটা ট্যুইট হয়েছিল? দীপংকর রায়ের হত্যাকাণ্ড নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কতগুলো পোস্ট পড়েছিল? কতজন সাধারণ মানুষ এর প্রতিবাদ করেছিলেন? কতজন রাজনৈতিক নেতা এর বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিলেন? প্রশ্ন কিন্তু উঠছে৷

রাজস্থানের নারকীয় ঘটনার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিচার হোক৷ উগ্র হিন্দুত্ববাদের নামে এই ধরনের বর্বরতাকে আইন কঠোর সাজা দিক৷ কিন্তু যারা শুধুমাত্র একটি ঘটনার প্রতিবাদ করেন আর বাকি ঘটনায় মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন তাদের কী হবে৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্যে একই ধরনের ঘটনায় মুখ বন্ধ করে রাখেন মুখ্যমন্ত্রী৷ রাজস্থানের ঘটনার প্রতিবাদ করেন৷ বুদ্ধিজীবীদেরও একই হাল৷ বিজেপি শাসিত রাজ্যে ঘটনা ঘটলে মুখ খোলেন৷ সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট পড়ে৷ কিন্তু একই নৃশংস ঘটনা বাংলায় ঘটলে চুপ থাকেন কেন?

আরও পড়ুন: সুপ্রিম কোর্টে ‘লাভ জিহাদে’র পক্ষে সওয়াল কংগ্রেসের কপিল সিব্বলের

গল্প হলেও সত্যি৷ প্রতিবাদের ভাষাও স্বার্থ অনুযায়ী প্রকাশ পায়৷ আর তাতেই অন্যায়ের বাড়বাড়ন্ত হয়৷ উগ্র হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে যেমন প্রতিবাদ হচ্ছে তেমনই উগ্র মুসলিম মৌলবাদের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদের ঝড় ওঠা উচিত৷ রাজনৈতিক রং, স্থান, ধর্ম, ভোটের হিসাব না দেখেই সব ঘটনার প্রতিবাদ হওয়া দরকার৷ তবেই সেই প্রতিবাদ মানুষের বিশ্বাসযোগ্য হবে৷ আইনের চোখে জাত-ধর্ম বাদ দিয়ে সব অপরাধীই যেদিন অপরাধী হবে সেদিনই ভারত আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করতে পারবে৷

----
--