নিখিলেশ রায়চৌধুরী: গত বুধবার (১৭ মার্চ, ২০১৮) ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র সাংবাদিক নিশিকান্ত কারলিকার লিখেছেন, আত্মসমর্পণ করলে দাউদ ইব্রাহিম আর্থার রোড জেলে থাকতে চায়৷ অন্তত সেই মর্মে আদালতে আরজি জানিয়েছে তার ছোট ভাই ইব্রাহিম কাসকার৷ যদিও সরকারের পক্ষ থেকে কাসকারের সেই আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়েছে৷ সরকারি কৌঁসুলি বলেছেন, ওভাবে শর্তসাপেক্ষে কোনও আত্মসমর্পণের আরজি গ্রাহ্য করা সম্ভব নয়৷ উপরন্তু দাউদ এখনও ধরা পড়েনি৷

আদালতে কাসকারের স্বীকারোক্তি, দাদার সঙ্গে মোবাইলে কথা হয় বটে, কিন্তু দাউদ কোথায় আছে সেটা তার জানা নেই৷ কিন্তু কাসকারের আরজি থেকে পরিষ্কার, দাউদ অন্তত বেঁচে থাকতে চায় এবং সেইজন্যই সে আবার দেশে ফিরতে চায়৷ কিন্তু এ কথাও দাউদ জানে যে, দেশে ফিরলেও তার বিপদ কাটবে না৷ তাই ভাইকে দিয়ে সে একেবারে সরাসরি আর্থার রোড জেলে বন্দি থাকার আবেদন জানিয়েছে৷ কারণ, আর্থার রোড জেল দাউদ ইব্রাহিমের খাসতালুক৷

- Advertisement -

এখনও যে দেশে ক্রিমিন্যাল ও মাফিয়ারা কোন জেলে বসে রাজত্ব করবে সে কথা অনায়াসে এবং অকপটে মহামান্য আদালতের কাছেও জানানোর স্পর্ধা ধরে, সেই দেশে দাগি অপরাধীদের হাতের পুতুল কারা আর পুতুল-নাচিয়েই বা কারা সে কথা বুঝতে কি কারও অসুবিধা হয়?

এই ব্যাপার যে অন্য দেশেও ঘটে না তা নয়৷ আমেরিকা-ব্রিটেন থেকে শুরু করে অনেক আধুনিক দেশেই জেলে বসে অপরাধীদের ছড়ি ঘোরাতে দেখা গিয়েছে৷ তবে, সেসব ব্যাপার ওই দেশগুলিতে ঘটত ১৯৩০-৪০-এর দশকে৷ এখন যেমন ঘটে ভারতের মতো দেশগুলিতে৷ লাতিন আমেরিকায় ড্রাগ মাফিয়ারা জেলে কেমন রাজার হালে কাটায় সেটা ১৯৮০-র দশকে কলম্বিয়ায় পাবলো এসকোবারের জেলে থাকার সংবাদ ও ছবি থেকেই বোঝা গিয়েছিল৷ এখন যেটা ঘটে চলেছে মেক্সিকোর মতো দেশে৷

বছর দুয়েক ধরেই দাউদ ভারতে এমন একটা সংকেত পাঠাতে চাইছে যা থেকে বোঝা যায় যে, সে আর ‘পরবাসে’ থাকতে চাইছে না৷ তার শক্তি কমে আসছে, আয়ুও৷ বিশেষ করে নোটবন্দির পর দাউদ যে ভালোমতোই ঘায়েল হয়েছে সেটা করাচিতে তার পোষা মানি-লন্ডারারের আত্মহত্যা থেকে স্পষ্ট৷
কিন্তু ভারতে আসার আগেই যদি তাকে কেউ ‘ইরেজ’ করে দেয়, তাহলে কি হবে? দাউদ অনেক কিছু জানে৷ আত্মসমর্পণ করে সমস্ত খবর যদি সে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে জবানবন্দিতে জানায় এবং সেই জবানবন্দি যদি ভারতের সাধারণ নাগরিকরা জানতে পারেন, তাহলে হয়তো বহু হৃষ্টপুষ্ট গণ্যমান্যের যাবজ্জীবন ঠিকানা হবে জেল৷ আর তাঁরা কেউই হয়তো তখন অন্ততপক্ষে আর্থার রোড জেলে যেতে চাইবেন না! ওই জেলের মধ্যেই দাউদ যদি পুরানো হিসাব উসুল করতে চায়, তখন!

দাউদের কাছ থেকে ভারতের এখন সব থেকে বেশি যেটা জানা দরকার সেটা এ-ই : সন্ত্রাসের ফান্ডিংয়ে সে কীভাবে এবং কাকে কাকে সাহায্য করেছিল? কারা তাকে সুরক্ষা দিয়েছিল? কোন কোন দেশের গুপ্তচর বিভাগ ভারতের বিরুদ্ধে তাকে কাজে লাগিয়েছিল এবং ডি কোম্পানির পঞ্চম বাহিনী ঠিক কী উপায়ে ভারতের ভিতরে থেকে সেই ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ড ও চক্রান্তে শামিল হয়েছিল?

একটা জিনিস বোঝা যাচ্ছে, দেশে ফিরে যদি প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হতে হয় তাতেও দাউদ ইব্রাহিমের আপত্তি নেই৷ এ রকম একটা বার্তা সে এর মধ্যে পাঠিয়েওছে৷ কিন্তু ফিরলে যদি সব সত্যই সে প্রকাশ করে দেয়, তাহলে? তাহলে হয়তো অনেক তথাকথিত গণ্যমান্য দেশবরেণ্যকে ফাঁসিতেও ঝুলতে হতে পারে৷

১৯৭৮ সালে ইতালিতে আলদো মোরো নামে এক জনপ্রিয় ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট নেতাকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছিল৷ প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছিল, রাস্তার উপর ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে-থাকা গাড়ি থেকে আলদো মোরোকে অপহরণ করেছিল সেখানকার কুখ্যাত মাওবাদীরা৷ কিন্তু আলদো মোরো নিহত হওয়ার পর তদন্ত ক্রমাগত এগতে থাকলে দেখা যায়, ওই অপহরণ ও হত্যা চক্রান্তে রেড স্টার মাওবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে শামিল হয়েছিল ইতালির রক্ষণশীল মিলিটারি পুলিশ অর্থাৎ কারাবিনিয়েরি, ইতালিয়ান মাফিয়া থেকে আমেরিকার সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি৷

দাউদ ইব্রাহিম ধরা দিলে যদি এ রকম সব কাণ্ডকারখানা ভারতেও প্রকাশ্যে আসে তখন কী হবে? বিশেষ করে সেই ১৯৯৩ সালের মুম্বই বিস্ফোরণ থেকে ২৬/১১, একের পর এক সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ সম্পর্কে যদি দাউদের সত্যকথন সাধারণ নাগরিকরা জেনে যায়!

দাউদকে হাতে পেলে তার সম্পর্কে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে সেটা ভারত সরকারই জানে৷ কিন্তু দাউদ যে আর অন্য কোনও রাষ্ট্রশক্তির তাঁবে থাকতে চাইছে না সেটা অন্তত তার ভাইয়ের আরজি থেকে পরিষ্কার৷

----