ধূলাগড়-বসিরহাটে নিশ্চুপ রুদ্রপ্রসাদ-কৌশিক-বিকাশ কেন রাজ্যের গণতন্ত্র বিপন্ন দেখছেন?

রাজ্যের রক্তাক্ত পঞ্চায়েত ভোটকে কেন্দ্র করে বেশ ‘উদ্বিগ্ন’ একদল বুদ্ধিজীবী বুধবার মুখ খুললেন৷ এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের তালিকায় দেখা গেল প্রাক্তন সিপিএম নেতা তথা লোকসভার স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন মেয়র তথা সিপিএম নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য৷ আর এই রীতিমতো লাল বুদ্ধিজীবীদের পাশে দেখা গেল নাট্যকার রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, অভিনেতা কৌশিক সেন এবং কবি মন্দাক্রান্তা সেনকে৷ এদিন এই সরব হওয়া বুদ্ধিজীবীদের পরিচয়ই রাজ্যবাসীর কাছে স্পষ্ট, এঁরা কারা! ফলে এঁরা ঠিক কী বলতে চান, তা সাংবাদিক সন্মেলনের আগেই স্পষ্ট বার্তা পাওয়া গিয়েছিল৷ যদিও নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুর কান্ডে তৃণমূন নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত শক্ত করা কৌশিক সেন অনেকদিন আগেই ‘পালটি’ খেয়েছেন৷ তার কারণও তিনি ব্যাখ্যা করেছেন৷


রানা দাস
এডিটর-ইন-চিফ
কলকাতা24×7

যাক এবার মূল কথায় আসা যাক৷ রক্তাক্ত পঞ্চায়েত ভোট দেখে বেশ আতঙ্কিত এবং শঙ্কার কথা প্রকাশ করেছেন বাংলার প্রখ্যাত নাট্যকার রুদ্রপ্রসাদবাবু৷ তিনি এদিন ভাবখানা এমন দেখালেন যেন মনে হল, তাঁর পাশে বসা সোমনাথবাবু এবং বিকাশবাবুদের সিপিএম আমলে উৎসবের মেজাজে, গলায় গলা দিয়ে পঞ্চায়েত ভোট হয়েছে৷ আমার মতো একজন ছাপোসা সাংবাদিকের একটাই প্রশ্ন, নয়ের দশকে কেশপুর, গড়বেতা, সবং, পিংলা, খেঁজুরি, ভগবানপুর মতোর এলাকাগুলিতে কীভাবে বিকাশবাবুদের পার্টি ভোট করাত, সেটা কী আপনার অজানা ছিল? হাওড়ার আমতায় এক কংগ্রেস কর্মী হাত চিহ্নে ভোট দেওয়ার জন্য সিপিএমের হার্মাদরা তাঁর দু’হাত কেটে দিয়েছিল, এই ঘটনা কী বাংলার প্রখ্যাত এই নাট্যকার জানেন না? সেই সব দিনগুলিতে কী আপনি এভাবে সংবাদমাধ্যমকে ডেকে প্রতিবাদে সরব হয়েছিলেন? না তা হলে আজ আপনার কোন স্বার্থে ঘা লাগল যে, দাঁড়ি চুলকোতে চুলকোতে এত উদ্বেগ প্রকাশ করলেন৷

অভিনেতা নাট্যকার কৌশিক সেনের স্পষ্ট বক্তব্য, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলেন সময় তিনি বর্তমান শাসক দলের কথা বলেছিলেন৷ এখনকার বিরোধীদল সিপিএমের নেতার ঔদ্ধ্যতের প্রতিবাদে সরব হয়েছিলেন৷ এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচনে হত্যালীলা হল, তার তিনি প্রতিবাদ করছেন৷ তাঁর কথা, সেদিনও তিনি ভুল করেননি৷ আজও করছেন না৷ তবে, তাঁর বক্তব্যে, সুষ্ঠুভাবে পঞ্চায়েত নির্বাচন করতে না পারার জন্য তৃণমূল সরকারের উদ্দেশ্যে তেমন কড়া মনোবভাব দেখাতে পারলেন না৷ কিন্তু, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভুমিকাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেললেন৷ না, মোদীর রাজ্য গুজরাতের দাঙ্গাকে সমর্থন করছি না৷ কিন্তু, একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী সেই দেশের অঙ্গরাজ্যে পঞ্চায়েত ভোটকে কেন্দ্র করে যে মৃত্যু মিছিল হয়ে গেল, তার জন্য তিনি শঙ্কা প্রকাশ করতেই পারেন৷

- Advertisement -

কর্ণাটক রাজ্যে জয়ের জন্য মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে বিজেপির বিজয়ী উৎসবে প্রধানমন্ত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘পঞ্চায়েত ভোটের নামে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে৷’ একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ভুলটা কী বলেছেন? তা বোধগম্য হল না৷ হ্যাঁ, আমি ইতিহাস ভুলে যেতে বলছি না৷ মোদীর আমলে গুজরাতে যে দাঙ্গা সংগঠিত করা হয়েছিল, সেই ইতিহাস না ভুলেই বলতে পারি এই ঘটনাকে সমর্থন করছি না৷ তবে, কৌশিকবাবুর কাছে একটাই প্রশ্ন, আপনি কী করে ইতিহাস ভুলে গেলেন৷ এদিন যাদের পাশে বসে সাংবাদিক সন্মেলন করলেন, তারাই কিন্তু মরিচ ঝাঁপি, ১৪ মার্চ নন্দীগ্রামে গণহত্যা, লালগড়ের নেতাইয়ে গণহত্যা সংগঠিত করেছিল৷ সেই সব ইতিহাস কী করে কৌশিকবাবু ভুলে গেলেন, তা বোধগম্য হল না৷

এদিনের সাংবাদিক সন্মেলনে রাজ্য সিপিএম নেতা বিকাশরঞ্জনবাবু কথাবার্তা বেশ সন্দেহজনক ঠেকল৷ তিনি বললেন, ২০১১ সালে এই রাজ্যে একটা নতুন সরকার আনার পরে মনে হয়েছিল, এই সরকার গণতন্ত্র রক্ষিত করবে৷ কিন্তু তা হল না৷ একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে বিকাশবাবুর কাছে প্রশ্ন, ২০১১ সালে বাম জমানার অবসান ঘটনার জন্য আপনিও কী তবে বর্তমান শাসকদলের পাশে ছিলেন? তা হলে কেন আপনার মুখ থেকে এই কথা বেরিয়ে এল অজান্তেই!

আরও একটা প্রশ্ন৷ আপনিও কী তবে স্বীকার করছেন যে, ৩৪ বছর আপনাদের দল রাজ্যের শাসকের আসনে থেকে মানুষ গণতন্ত্র সুরক্ষিত করতে পারেনি? উত্তরটা খুব সহজ৷ হ্যাঁ৷ আপনারাও গণতন্ত্রকে হত্যা করেছিলেন৷ এই রাজ্যের আপনারাই পথ দেখিয়েছিলেন কী করে গণতন্ত্রকে হত্যা করতে হয়৷ আর সেই পথেই এখন হাঁটছে রাজ্যের শাসকদল৷ আপনারা ঠিক যে কায়দায় কেশপুর, গড়বেতা, চন্দ্রকোনা, ছোটআঙারিয়া, সবং, পিংলা, ভগবানপুর, খেঁজুরি, পটাশপুরের মতো এলাকায় ভোট করাতেন, ঠিক সেই ভাবেই আজকের শাসকদল পঞ্চায়েত ভোট করিয়েছে৷

সেইদিনও মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করার অধিকার বিকাশবাবুরা কেড়ে নিয়েছিলেন৷ সেই পথ ধরেই বর্তমান শাসকদলও একই কাজটা করেছে৷ আর মৃত্যুর সংখ্যা বিচার করে কারা ভালো আর কারা খারাপ, তা নির্ধারণ করা যায় না৷ একজনের গাঁয়ে আঁচর সন্ত্রাসের মাপকাঠি হতে পারে না৷

রাজনৈতিক ভদ্রলোক, প্রাক্তন স্পিকার সোমনাথবাবুর উদ্বেগ প্রকাশে তেমন আশ্চর্য হয়নি৷ তবে, ওঁনার কাছেও একটা প্রশ্ন করতেই হয় যে, আপনাদের আমলেও কি কোনদিন অবাধ এবং শান্তিপূর্ণভাবে পঞ্চায়েত ভোট করাতে পেরেছেন? আপনার নিজের জেলা বীরভূমের নানুরের গণহত্যার কথা নিশ্চয় আপনার ভুলে যাওয়ার কথা নয়৷ সেদিনও কী এই ঘটনার জন্য দলের মধ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে পেরেছিলেন? পেরেছিলেন আজকের মতো সাংবাদিক সন্মেলন করতে? পারেননি এবং তা করেননি৷ কারণ, সেই সময় প্রতিবাদ করলে পরমাণু চুক্তির কারণে নয়, এই কারণে দল থেকে বহিস্কার করত আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের ম্যানেজাররা৷

রাখঢাক না রেখেই বলতে পারি এদিন বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা বাংলার রক্তাক্ত পঞ্চায়েত ভোটের তীব্র সমালোচনা করলেন৷ এদিন প্রায় প্রত্যেকের কথাতেই একটা বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, এই রাজ্যে যে গণতন্ত্রের হত্যা হল, তার জন্য বর্তমান শাসকদলকে যতটা না কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হল, তার চেয়ে অকারণে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্য৷ এই পঞ্চায়েত ভোটে শাসকের ছাপ্পা-সন্ত্রাস-রিগিংয়ে যে তীব্র প্রতিরোধ বিজেপি সংগঠিত করল, তাকেই কি ভয় পাচ্ছে এই বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা? যা অন্য বিরোধীরা পারেনি, ১৪ মে কিন্তু সেটাই করে দেখিয়েছে গেরুয়া বাহিনী৷ এই গেরুয়া ঝড় আটকাতেই কি এদিন বিকাশ-রুদ্রনাথবাবুরা সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হলেন?

ফাইল ছবি

আমার সঙ্গে হয়তো অনেক বঙ্গবাসীই প্রশ্ন করতেই পারেন, আচ্ছা কালিয়াচক, ধূলাগড়-বসিরহাটের ঘটনার সময় কেন আপনারা নিশ্চুপ ছিলেন? কেন শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কেন রাজপথে নামেননি? রাজ্যে অশান্তির বাতাবরণ সৃষ্টিকারীদের সমালোচনা করেননি? তাই এদিন গণতন্ত্র বিপন্ন বলে চিল-চিৎকার বুদ্ধিজীবীদের ভুমিকা নাটুকে বলেই বলে মনে হয়েছে৷ অন্তত মরিচঝাঁপি, নন্দীগ্রাম-নেতাইয়ের গণহত্যা কান্ডের ‘সেনাপতি’দের গণতন্ত্র বিপন্ন বলে চিৎকার ভেক ছাড়া আর কিছুই নয়৷

Advertisement ---
---
-----