শুধু চীন নয়, পাকিস্তানের সামরিক অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখছে আমেরিকাও

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদনে মার্কিন কংগ্রেস পাকিস্তানের সামরিক খাতে ৮ কোটি ডলার মঞ্জুর করেছে৷ মার্কিন প্রশাসনের শর্ত, পাকিস্তান যদি সন্ত্রাস রোধে কড়া ভূমিকা নেয় তাহলে তারা আরও বেশি প্রতিরক্ষাগত অনুদান পাবে৷ তা না হলে পাবে না৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মামনুন রাষ্ট্রসংঘের কালো তালিকাভুক্ত বেশ কিছু পাক মদতপুষ্ট কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের বিরুদ্ধে অর্ডিন্যান্স জারি করেছেন৷ সেই তালিকায় লস্কর-ই-তোইবা রয়েছে, তেহরিক-ই তালিবান পাকিস্তান রয়েছে, কিন্তু মাসুদ আজহার কিংবা জয়েশ-ই মহম্মদ নেই৷

হয়তো পাক সরকারের এই পদক্ষেপই ইসলামাবাদের জন্য মার্কিন কংগ্রেসে সামরিক অনুদান মঞ্জুর হওয়ার একটি বড় কারণ৷ কিন্তু ভারত যে জয়েশ-ই মহম্মদের নেতা মাসুদ আজহারকে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ব্ল্যাক লিস্টেড করার জন্য এত চেষ্টা করছে সেক্ষেত্রে কোনও ইতিবাচক সাড়া কেন পাক সরকারের দিক থেকে মিলল না, সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন৷ আরও আশ্চর্য যে, আমেরিকার জনপ্রতিনিধিরাও তা নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য না করেই ফের পাকিস্তানকে সামরিক খাতের বরাদ্দে অনুমোদন দিতে রাজি হয়ে গেলেন৷

কিছু দিন আগেই আমেরিকার বিদেশ সচিব টিলারসন অবিলম্বে সন্ত্রাস বন্ধের জন্য পাকিস্তানকে কড়া ধমক দিয়েছিলেন৷ এমনকী, পাকিস্তান যদি এ ব্যাপারে উদ্যোগী না হয়, তাহলে আমেরিকার তরফ থেকে সমস্ত বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ার করেছিলেন৷ তার পরেও আমেরিকার আইনসভায় পাকিস্তানের জন্য প্রচুর পরিমাণে অর্থ বরাদ্দ করা হল৷ করা হল জম্মু-কাশ্মীরের ভারতীয় সেনা ছাউনিতে জয়েশ-ই মহম্মদের ফিদায়েঁ আক্রমণের পর৷

ভারতের রাজনৈতিক দলগুলির তরফে একটা অদ্ভূত অস্বচ্ছতা আছে৷ তারা মুখে যতই দেশপ্রেমের কথা বলুক, এমন কিছু বোঝাপড়া আন্ডার দ্য টেবল তারা করে চলে, যার জন্য শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের সামরিক অস্তিত্বই টিঁকে যায়৷ মাঝখানে মনে হচ্ছিল, ট্রাম্প প্রশাসন এবার বোধহয় ইসলামাবাদের পাশে থাকা না-থাকা নিয়ে একটা হেস্তনেস্ত করে ফেলবে৷

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে-ই তারাই পাকিস্তানের জন্য ফের সামরিক বরাদ্দ মঞ্জুর করল এবং ভবিষ্যতে তাদের কথামতো চললে আরও বেশি পরিমাণে অর্থ দেওয়ার আশ্বাসও দিয়ে দিল৷ ভারতেরই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে কাশ্মীর নীতি নিয়ে দোলাচল থাকার জন্যই কি এটা ঘটল?

পাকিস্তানের সামরিক শক্তির ব্যাপারটা এ রকম৷ কমিউনিস্ট চীনের সঙ্গে যদি ভারতের সম্পর্ক নমনীয় হয়, তাহলে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও সন্ত্রাসের মদতদাতারা তৎক্ষণাৎ তাদের পুরানো পৃষ্ঠপোষক আমেরিকার দিকে ঢলে, আবার আমেরিকার প্রশাসন যদি তাদের উপর চাপ সৃষ্টি করে অমনি তারা তাদের ‘সব ঋতুর বন্ধু’ চীনের হাত ধরে ঝুলে পড়ে৷ এখন এহেন বিষফোঁড়াটিকে কেটে ফেললে যে শুধু ভারত নয়, গোটা বিশ্বেরই উপকার হত সে কথা মার্কিন প্রশাসন কিংবা চীনের কমিউনিস্ট কর্তাদের কে বোঝায়?

এখনও বিশ্বজুড়ে যে কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাস চলছে তার আঁতুড়ঘর কিন্তু সেই পাকিস্তান৷ আইএসআই-ই তাদের রক্ষক এবং প্রশিক্ষক৷ আফগানিস্তানের বুকে আল-কায়েদা, বিভিন্ন তালিবান গোষ্ঠীর পাশাপাশি আজ যে ইসলামিক স্টেটের এত বাড়বাড়ন্ত তার জন্যও কিন্তু দায়ী সেই পাক সামরিক প্রতিষ্ঠান৷ যারা এখনও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রাষ্ট্র হিসাবে দিব্যি দুষ্কর্ম চালিয়ে যাচ্ছে৷

একটা সময় আসে যখন সত্যিই একটা বড় সিদ্ধান্ত নিতে হয়৷ বেশ কিছু দিন আগে আমেরিকার এক জনপ্রতিনিধি হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে পাকিস্তানকে পুরোপুরি অনুদান বন্ধ করার জন্য একটি বিল এনেছিলেন৷ সেই বিলের পক্ষে কিন্তু সমর্থকেরও অভাব ছিল না৷ তার পরেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মার্কিন কংগ্রেসে পাকিস্তানের জন্য ঢালাও সামরিক বরাদ্দ মেনে নিল৷ এখন সেটা জম্মুতে জয়েশ-ই মহম্মদের ফিদায়েঁ আক্রমণের জন্য পুরস্কার কি না, সেটা কে বলবে!

সন্দেহটা বাড়ার আরও কারণ, মাসুদ আজহারকে কালো তালিকাভুক্ত করার জন্য ভারত যখনই রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব পেড়েছে তখন আমেরিকা তাকে সমর্থন জানিয়েছে৷ জানায়নি কেবল কমিউনিস্ট চীন৷ অথচ, সেই জয়েশ-ই মহম্মদের উপরেই যখন ইসলামাবাদ নিষেধাজ্ঞা চাপাল না তখন আমেরিকার আইনসভা তা নিয়ে কিন্তু কোনও প্রতিবাদ করল না৷

উলটে, পাকিস্তানের জন্যই সামরিক বরাদ্দ মঞ্জুর করতে রাজি হয়ে গেল৷ বোঝাই যাচ্ছে, আমেরিকার প্রশাসন কিংবা আইনসভা সেখানকার বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলির ইচ্ছা-অনিচ্ছার বাইরে গিয়ে কিসসু করতে পারে না!