পাঁচশ বছরের বৃদ্ধ হাওড়ার ‘অতুলনীয়’ সন্তানরা বিলুপ্তির পথে

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, হাওড়া: অবলুপ্তির পথে চলে আসা প্রাণীদের বাঁচাতে লড়ছে হাওড়ার বন দফতর। জেলা বনবিভাগ সূত্রে খবর, অবলুপ্তির কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে বন বেড়াল, বেজি ও ভামের দল৷ প্রায় পাঁচশ বছরের পুরনো হাওড়া জেলার ইতিহাস থেকে তারা ক্রমশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে৷

বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের বাঁচাতেই বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে হাওড়ার বনবিভাগ। সচেতনতা শিবির থেকে শুরু করে পথ নাটিকা। কিছু ক্ষেত্রে এনজিও-র সাহায্য নেওয়া হচ্ছে৷

হাওড়ার বর্তমান জনবসতি ৪লক্ষ ৮৫ হাজার ২৯ জন(জেলার ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী)। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৩ হাজার ৩০৬ জনের বাস৷ অসচেতনতার কারণে জেলা থেকে হারিয়ে যেতে বসেছ বন বিড়াল, বাঘরোল, ভাম, বেজি, শুশুক, বাদুড়ের মতো বেশ কয়েকটি প্রাণী। একই অবস্থা রাজ্যের৷

- Advertisement -

হাওড়ারই বাসিন্দা পরিবেশবিদ সুভাষ দত্ত। এই প্রসঙ্গে মানুষের অসচেতনতা নিয়ে কড়া ভাষায় বলেন, “আমরা শুধু ছুটছি। নিজের স্বার্থের জন্য মা ছেলের সঙ্গে ব্যবসা করে, ভাই বোনের সঙ্গে। সেখানে বন্য প্রাণী কে মরলো, কে বাঁচল অত দেখার সময় কোথায়? যারা এসব নিয়ে ভাবেন তাঁরাই এখন ঘোর বিপদের মধ্যে রয়েছেন।”

হাওড়ার বনপাল নিরঞ্জিতা মিত্র জানিয়েছেন, “ শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও প্রাণীদের নিয়ে সচেতনতা ক্রমে তলানিতে এসে ঠেকছে। শহরের দিকে ফ্ল্যাট বাড়ির সংখ্যা বাড়ার ফলে ওদের থাকার জায়গাও কমে যাচ্ছে। তাই ওরা আজ মারাত্মক বিপদের মধ্যে রয়েছে। ওদেরকে বাঁচাতেই আমরা প্রত্যেকদিন লড়ছি। সল্ট লেকের বন দফতর থেকেও আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এদের রক্ষা করার জন্য।”

বাঘরোল – ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া-সহ মোট ১১টি দেশে দেখা মেলে বাঘরোল বা ফিশিং ক্যাটের৷ আদি বাসস্থান বাংলা৷ হাওড়া জেলার আমতা, শ্যামপুর, উলুবেড়িয়া, জগৎবল্লভপুরের জলা জঙ্গলে বাঘরোল দেখা যেত একসময়৷ তবে সংখ্যা কমে এসেছে৷ বনবিভাগ সূত্রে খবর, বিশ্বজুড়ে অন্তত তিন হাজারের আশপাশে এসে দাঁড়িয়েছে এই প্রাণী৷ হাওড়াতেই সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বাঘরোল৷ আবার এই জেলাতেই বাঘরোল নিধনের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

সরকারি আইন অনুযায়ী বাঘরোল মারলে সাজা তিন বছরের জেল ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা। এটিও বন সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী তফসিল ১ –এর মধ্যে পড়ে। তাই সাজা জামিনের অযোগ্য।

বন বিড়াল – জেলার মূলত জলাভূমি অঞ্চলেই মেলে বনবিড়াল৷ ভারতীয় বন সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী তফসিল ১ –এর মধ্যে পড়ে এই প্রাণী। বন বিড়াল হত্যা করে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাজা জামিনের অযোগ্য( আইন অনুযায়ী সাজার পরিমাণ নির্ভর করে দোষের মাপকাঠির উপর)।

বেজি – গ্রাম শহরের মাঝামাঝি অঞ্চলে এই প্রাণীর দেখা মেলে। সাপই এদের প্রধান খাদ্য । গ্রামাঞ্চলে সাপের কামড়ে বহু মানুষ মৃত্যুর খবর মেলে। অথচ এদেরই সরিয়ে ফেলার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে মানুষ। এটি তফসিলি – ২ এর মধ্যে পড়ে। এই প্রাণীর হত্যা জামিনের অযোগ্য না হলেও তবে নুন্যতম তিন মাস জেল হতে পারে।

শুশুক এবং ভাম দুটিই বন্য প্রাণী সংরক্ষণ তফসিলি – ২ এর মধ্যে পড়ে। বাদুর এখনও তফসিল ভুক্ত প্রাণীদের তালিকায় এখনও না পৌঁছালেও। এরাও বেশ সঙ্কটে রয়েছে বলে জানিয়েছেন হাওড়ার বনপাল নিরঞ্জিতা মিত্র। তিনি বলেন, “ এরা কেউই আর সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে থাকে না। আমরা এদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য সচেতনতা শিবির গড়ছি। সেখানে এলাকাবাসীকে আমরা বোঝাচ্ছি যে বাস্তুতন্ত্রকে ধরে রাখার জন্য এই প্রাণীদের ভূমিকা কতটা প্রয়োজনীয়।” পথ নাটিকার মাধ্যমেও এই প্রাণীদের নিয়ে বিভিন্ন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছি।” এই কাজে কিছু ক্ষেত্রে সাড়াও মিলেছে। মানুষ নিজে থেকেই এগিয়ে আসছে আমাদের কাজে সাহায্য করতে।

বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের এই চেষ্টা চলছে, চলবেও। নিজের পায়েই কুড়ুল মেরে চলা মানব সভ্যতা ব্যস্ত গতির সঙ্গে তাল মেলাতে। এতে ভুল নেই। কারণ সময়ের সঙ্গে এগিয়ে যেতে হয়। কিন্তু মাঝে একবার থেমে যে দেখতেও হয়।

Advertisement
---