বিরিয়ানি-রাজনীতির মেগা-শোয়ে চুলোয় স্বাস্থ্যরক্ষা

ছবি: মিতুল দাস৷

বিশ্বজিৎ ঘোষ, কলকাতা: আগে বিরিয়ানি৷ আর, তার সঙ্গে চলুক রাজনীতি৷ তাতে, চুলোয় যাক স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি৷ লাটে উঠুক স্বাস্থ্যরক্ষায় অঙ্গীকারও৷

তেমনই হল মঙ্গলবার৷তাও আবার পরিবেশিত হল কার্যত এক মেগা-শোয়ের আদলে৷আর, ওই মেগা-শো পরিবেশিত হল আবার খোদ তৃণমূল কংগ্রেসের ডাক্তারদের সংগঠনের আয়োজনেই৷

মঙ্গলবার, সাত এপ্রিল, বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস৷ আর, এই দিনটি স্মরণের জন্যই, মঙ্গলবার কলকাতার ইনস্টিটিউট অফ পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (আইপিজিএমইআর)-এ এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এ রাজ্যের শাসকদলের ডাক্তারদের সংগঠন প্রোগ্রেসিভ ডক্টরস অ্যাসেসিয়েশন (পিডিএ)৷ স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের সমস্যার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য, পিডিএ এ দিন ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে৷  কিন্তু, স্বাস্থ্যরক্ষার আয়োজন হলে কী হবে, এ দিনের ওই অনুষ্ঠান শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় কার্যত এক মেগা-শোয়ের৷ ওই মেগা-শো, বিরিয়ানি সহযোগে রাজনীতির৷ যে কারণে, লাটে উঠল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের অঙ্গীকার৷ চুলোয় গেল স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জনসচেনতা বৃদ্ধির আলোচনাও৷

- Advertisement -

মেগা-শো-ই বটে৷ কেন?  কারণ, স্থির হয়েছিল, মঙ্গলবার বেলা দুটোয় শুরু হবে ওই অনুষ্ঠান৷ যদিও, পিডিএ-র কেউ কেউ আবার জানতেন, দুটো নয় বেলা তিনটে থেকে ওই অনুষ্ঠান শুরু হবে৷ কেননা, বেলা তিনটে নাগাদ ওই অনুষ্ঠানে পৌঁছনোর কথা পিডিএ-র সভাপতি, বিধায়ক ডাক্তার নির্মল মাজির৷ সেই মতোই চলছিল সবকিছু৷ কলকাতার আইপিজিএমইআর-সহ বিভিন্ন হাসপাতাল আর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে ভিড় জমাতে শুরু করেন শাসকদলের ডাক্তার সংগঠনের নেতা-সদস্যরা৷ এর মধ্যে অবশ্য বিরিয়ানির গন্ধে ম ম করতে শুরু করে দিয়েছে কলকাতার আইপিজিএমইআর-এর অ্যাকাডেমিক বিল্ডিং (মঙ্গলবার পিডিএ-র অনুষ্ঠান ওই বিল্ডিংয়ের সেকেন্ড ফ্লোরের লেকচার থিয়েটারেই হয়)৷

কে হাজির হননি ওই মেগা-শোয়ে! পিডিএ-র কর্তা-সদস্যরা তো বটেই, সেখানে হাজির হন কলকাতার আইপিজিএমইআর-এর শীর্ষস্তরের কর্তারাও৷ রাজ্যের সেরা ওই সরকারি হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের অনেকেই পিডিএ-র কর্তা-সদস্য৷ শেষ পর্যন্ত বেলা চারটে নাগাদ পৌঁছলেন নির্মল মাজিও৷ আর, তার পরেই শুরু হল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের ওই অনুষ্ঠান৷ তবে, অনুষ্ঠান শুরু হলে কী হবে, পিডিএ-র সদস্যদের তখন পৃথক দু’টি লম্বা লাইন পড়ে গিয়েছে ওই বিল্ডিংয়ের সেকেন্ড ফ্লোরে৷ বিরিয়ানির গন্ধে মেতে ওই লাইনের একটির লেজ আবার পৌঁছে গিয়েছে লেকচার থিয়েটারের ভিতরেও৷ কারণ, নাম নথিভুক্ত করতে যে হচ্ছে পিডিএ-র সদস্যদের৷ সেজন্যই পৃথক ওই দু’টি লম্বা লাইন৷ আর, নাম নথিভুক্তির সঙ্গে মিলছে বিরিয়ানির প্যাকেট-পানীয় জলের বোতল আর পি জি দর্পণ (পিডিএ-র এসএসকেএম হাসপাতাল শাখার মুখপত্র হিসেবে এ দিনই ওই পি জি দর্পণের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে)৷ নাম নথিভুক্তের জন্য পিডিএ-র কয়েকজন সদস্য আবার চিন্তায়ও পড়ে গেলেন৷ কারণ, তাঁরা যে পিডিএ-র পরিচয়পত্র সঙ্গে করে আনতে ভুলে গিয়েছেন৷

তা হলে উপায়! অনুষ্ঠানের শুরুতে অবশ্য কলকাতার আইপিজিএমইআর-এর অধিকর্তা প্রদীপ মিত্রর প্রত্যাশা ছিল, সেখানে এ দিন বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হবে৷ কিন্তু, কোথায়, কী! ওই অনুষ্ঠান যে শেষ পর্যন্ত বিরিয়ানি-রাজনীতির মেগা-শোয়েই পরিণত হল৷ যদিও, বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের জন্যই যে এ দিনের ওই আয়োজন, তা বোঝাতে অবশ্য কার্পণ্য করেনি পিডিএ৷ আর, সেজন্য, ওই লেকচার থিয়েটারে বিশাল মাপের ব্যানারে মুখ্যমন্ত্রী মমতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি সহযোগে লেখা হয়েছে, প্রোগ্রেসিভ ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন প্রেজেন্টস পাবলিক অ্যাওয়ারনেস অন হেলথ প্রবলেমস অন ওয়ার্ল্ড হেলথ ডে৷ বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের জন্য হু (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা)-র নির্ধারিত এ বছরের থিম, ‘হাউ সেফ ইজ ইওর ফুড?  ফ্রম ফার্ম টু প্লেট, মেক ফুড সেফ’৷ পিডিএ-র ওই ব্যানারেও লেখা হয়েছে, ‘ফ্রম ফার্ম টু প্লেট/ মেক ইওর ফুড সেফ’৷

তবে, ওই পর্যন্তই৷  কারণ, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের সমস্যার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সেভাবে কোনও আলোচনা তো হলই না ওই অনুষ্ঠানে, বরং, পিডিএ-র সভাপতি নির্মল মাজির গোটা বক্তব্যেই কার্যত রাজনীতিরই প্রকাশ পেল৷ কারণ,  শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত (প্রায় এক ঘন্টা) এ রাজ্যের সরকারি চিকিৎসা পরিষেবা সহ অন্যান্য বিষয়ে ‘দিদি’ (মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়)-এর কর্মযজ্ঞের বিষয়ে বলে গেলেন পিডিএ-র সভাপতি৷ বাদ যায়নি সংবাদমাধ্যমের একাংশের প্রতি তাঁর সমালোচনাও৷ তবে, একই সঙ্গে ডাক্তারদের দায়িত্ব ভুলে না যাওয়ার কথাও তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন এ দিন৷ যদিও, প্রায় এক ঘন্টা তিনি বলেছেন, তবে তার মধ্যেই ওই লেকচার থিয়েটারেই বিরিয়ানিতে মন দিয়েছেন পিডিএ-র অনেক সদস্য৷ এ দিকে, সেরার মনোভাবে এসএসকেএম হাসপাতালে অবহেলার শিকার হচ্ছেন রোগীরা৷ তার উপর আবার, সরকারি মদতে নিষিদ্ধ ওষুধের ব্যবসা হচ্ছে রাজ্যের সেরা ওই সরকারি হাসপাতালে৷ তা সত্ত্বেও, এর আগেও, তৃণমূল কংগ্রেসের ডাক্তারদের শুদ্ধিকরণের জন্য দাওয়াই হিসেবে দেখা গিয়েছে নির্মল হাওয়া

গত লোকসভা নির্বাচনের সময় এ রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিটি প্রার্থীর হয়ে প্রচারের জন্য পিডিএ-র নেতা-সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছিলেন নির্মল মাজি৷ আসন্ন পুরভোটের জন্যেও দেওয়া হয়েছে সেই একই ধরনের নির্দেশ৷ এ প্রসঙ্গে নির্মল মাজি বলেন, ‘‘কাজের সময় তো আট ঘন্টা৷ তার পর ডাক্তারদেরও অবসর সময় রয়েছে৷ আসন্ন পুরভোটের জন্য সেই অবসর সময়েই মুখ্যমন্ত্রীর বিভিন্ন কর্মযজ্ঞের বিষয়ে রোগী, তাঁদের পরিজন সহ পরিচিতদেরও বোঝাবেন পিডিএ-র সদস্যরা৷মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে যে সব কুৎসা আর অপপ্রচার চলছে, সে সবের বিষয়েই বোঝাবেন পিডিএ-র সদস্যরা৷’’ এ দিকে, এ দিনের অনুষ্ঠানে ৩০০ জনের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছিল৷ কিন্তু, ৫০০ জনের বেশি পৌঁছে যাওয়ায়, ফের বিরিয়ানি আনাতে হয়৷ পিডিএ-র এসএসকেএম হাসপাতাল শাখার এক কর্তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের অনুষ্ঠানে বিরিয়ানি, শরীর খারাপ হবে না? তিনি অবশ্য কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে বলেন, ‘‘না হবে না৷’’ যদিও, এ দিনের অনুষ্ঠানে ঘোষণা হয়েছিল, পিডিএ-র সভাপতির বক্তব্যের পরে সায়েন্টিফিক সেশন থাকছে৷কিন্তু, পিডিএ-র সভাপতি চলে যাওয়ার পর, সেভাবে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি ওই সায়েন্টিফিক সেশন৷ কারণ, পিডিএ-র অধিকাংশ সদস্যই চলে গিয়েছিলেন৷

=======================================================

Advertisement
-----